ক্রীড়া ডেস্ক
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফুটবল স্কোয়াড ছবি: উয়েফা অফিশিয়াল
বিশ্বকাপের মঞ্চ সবসময়ই নতুন কোনো রূপকথার জন্ম দেয়। ফেবারিটদের ভিড়ে এমন কিছু দল থাকে যারা অনায়াসে বড় দলগুলোর হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে ঠিক তেমনি এক ‘ডার্ক হর্স’ বা চমকে দেওয়ার মতো দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সব রকম রসদ রয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্কোয়াডে। পুরো দলটির দিকে তাকালে প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো— অভিজ্ঞতা এবং উদীয়মান তরুণ প্রতিভার এক চমৎকার ভারসাম্য।
বসনিয়ান ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি এডিন জেকো। বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই হলেও আক্রমণভাগে তার উপস্থিতি দলটির জন্য এক বিশাল বড় শক্তি। জেকোর এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব দেওয়ার দারুণ ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচের মানসিকতা পুরো দলকে উজ্জীবিত রাখবে।
তবে এবারের বসনিয়া দলটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের নতুন প্রজন্ম। এই দলে এমন অনেক টেকনিক্যাল এবং গতিময় ফুটবলার রয়েছেন, যাদের অনেকেরই জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিজ দেশের বাইরে, ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল পরাশক্তি দেশে। শারীরিকভাবে লম্বাচওড়া এবং শক্তিশালী এই তরুণরা বসনিয়াকে প্রথাগত ধারা থেকে বের করে একদম আধুনিক ও গতিশীল ফুটবল খেলতে সাহায্য করছে।
বিশ্বকাপের মাঠে বসনিয়াকে সম্ভবত ৩-৪-২-১ অথবা ৩-৫-২ ফরমেশনে খেলতে দেখা যাবে। এই ধরনের ট্যাকটিক্সে উইং-ব্যাকদের ভূমিকা থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর বসনিয়ার বর্তমান স্কোয়াডে এই পজিশনে খেলার মতো দারুণ সব ফুটবলার রয়েছেন।
রাইট উইং: পর্তুগালের ক্লাব বেনফিকায় খেলা ২৩ বছর বয়সী তরুণ আমের ডেডিচ সামলাবেন ডান পাশ। অস্ট্রিয়াতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের গতি এবং বল টেনে সামনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ।
লেফট উইং: বাম পাশে থাকবেন ইতালির আতালান্তায় খেলা অভিজ্ঞ খেলোয়াড় সেয়াদ কোলাশিনাথ। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ৬ ফুট উচ্চতার কোলাশিনাথের শারীরিক শক্তি এবং রক্ষণাত্মক কৌশল দলের বড় ভরসা।
এই দুই উইং-ব্যাক ডিফেন্সে যেমন দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারবেন, তেমনি কাউন্টার অ্যাটাকের সময় চোখের পলকে আক্রমণে গিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন। বসনিয়ার ট্রানজিশন বা রক্ষণ থেকে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি হবে এই ডেডিচ ও কোলাশিনাথ জুটি।
মাঝমাঠে বসনিয়া সম্ভবত বল পজিশন ধরে রেখে খুব বেশি পাসিং ফুটবল খেলবে না। তাদের মূল পরিকল্পনা হবে একটি ‘কমপ্যাক্ট মিডব্লক’ বা ঠাসাঠাসি মধ্যমাঠ তৈরি করা, যাতে প্রতিপক্ষ সহজে জায়গা না পায়। এরপর প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে কাউন্টার আক্রমণে যাওয়া। এই কাজের জন্য তাদের মাঝমাঠে রয়েছেন একঝাঁক লম্বা ও শক্তিশালী ফুটবলার:
বেঞ্জামিন তাহিরোভিচ ও আমির হাদযিয়াহমেতোভিচ: সুইডেন এবং ডেনমার্কে জন্ম নেওয়া এই দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বল পুনর্দখল এবং প্রতিপক্ষের প্রেস ভেঙে ফরোয়ার্ড পাস দেওয়ার কাজে দারুণ দক্ষ। বিশেষ করে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার তাহিরোভিচের মধ্যে আধুনিক ‘ডিপ-লাইং মিডফিল্ডার’ হওয়ার সব গুণ রয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সে নিজের সেরাটা দিতে পারলে এবারের বিশ্বকাপের ‘ব্রেকআউট স্টার’ বা টুর্নামেন্টের সেরা আবিষ্কার হতে পারে।
আরমিন গিগোভিক: সুইডেনে জন্ম নেওয়া এই বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। মাঝমাঠে শারীরিক শক্তির লড়াইয়ে তিনি বড় ভূমিকা রাখবেন।
আক্রমণে বসনিয়ার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে জার্মানির ভিএফবি স্টুটগার্টের এরমেদিন ডেমিরোভিচ এবং অধিনায়ক এডিন জেকোর রসায়নের ওপর। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ডেমিরোভিচ মাঠে প্রচুর দৌড়াতে পারেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের প্রেস করতে পারেন এবং ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতে ওস্তাদ। অন্যদিকে, ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার জেকো ডি-বক্সের ভেতর এখনও অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং নিখুঁত ফিনিশার।
ফলে ডেমিরোভিচ কিছুটা নিচে নেমে খেলা তৈরি করতে পারবেন এবং জেকো বক্সে থেকে গোল করার মূল দায়িত্বে থাকবেন।
এছাড়াও বেঞ্চ থেকে এসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব পিএসভি আইনদহোভেনের তরুণ এস্মির বায়রাকতারেভিচ এবং অস্ট্রিয়ার রেড বুল সালজবুর্গের ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার তরুণ কেরিম আলাইবেগোভিক। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া আলাইবেগোভিকের ড্রিবলিং, গতি এবং সরাসরি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে হানা দেওয়ার ক্ষমতা বড় দলগুলোর জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে।
একমাত্র দুর্বলতা
রক্ষণভাগে বসনিয়ার মূল ইউএসপি বা শক্তি হলো তাদের শারীরিক উচ্চতা এবং এরিয়াল ডুয়েল বা আকাশে ভেসে আসা বল বিপদমুক্ত করার ক্ষমতা। কোলাশিনাথের সাথে জার্মানির শালকেতে খেলা ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার নিকোলা কাটিচ এবং ইতালির সাম্পদোরিয়ার ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ডেনিস হাদযিকাদুনিচ মিলে এক অভেদ্য ব্যাকলাইন তৈরি করবেন।
তবে এই ডিফেন্সের একটি দুর্বলতাও রয়েছে। স্প্যানিশ বা লাতিন দলগুলোর মতো অতিরিক্ত গতিময় ও টেকনিক্যাল দলের বিপক্ষে হাই-লাইন (ডিফেন্সকে মাঝমাঠের কাছাকাছি এগিয়ে নিয়ে আসা) ব্যবহার করলে তারা বিপদে পড়তে পারে। গতিতে পিছিয়ে পড়ার কারণে ডিফেন্সের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে পারে, যা প্রতিপক্ষ কাজে লাগাতে পারে।
গোলপোস্টের নিচে প্রথম পছন্দ হিসেবে থাকবেন ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক নিকোলা ভাসিল। রিফ্লেক্স এবং শট ঠেকানোর ক্ষেত্রে তিনি বেশ নির্ভরযোগ্য হলেও বল পায়ে বিল্ড-আপ করার ক্ষেত্রে ইউরোপের এলিট গোলরক্ষকদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে। তাই বসনিয়া ডিফেন্স থেকে ছোট ছোট পাসে ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ও বাস্তবসম্মত ফুটবল খেলতেই বেশি পছন্দ করবে।
বিশ্বকাপের সম্ভাবনা: কতদূর যেতে পারে বসনিয়া?
সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, বসনিয়া হয়তো প্রতিটি ম্যাচে বলের দখল বা ডমিনেশন ধরে রাখতে পারবে না, তবে তারা যেকোনো বড় দলের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রতিপক্ষ হবে। শারীরিক শক্তি, ক্ষিপ্র কাউন্টার আক্রমণ এবং সেট-পিস (কর্নার বা ফ্রি-কিক)— এই তিন অস্ত্রে তারা যেকোনো ম্যাচ নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারে।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে তাদের অনায়াসে পরবর্তী রাউন্ড বা নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোয়ার্টার ফাইনাল বা শেষ আটের বৈতরণী পার হওয়া তাদের জন্য বেশ কঠিন হবে। নির্দিষ্ট কোনো দিনে তারা বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তিকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু টুর্নামেন্টে অনেক দূর যেতে হলে যে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, সেটাই হবে এই লড়াকু দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।