ফাহিম ফারহাদ
ইতিহাদ স্টেডিয়ামে আগুয়েরোর সেই জার্সি ঘোরানো উল্লাসের মূর্তিটি আজ সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষ্য দিচ্ছে ছবি: ম্যানচেস্টার সিটি অফিসিয়াল
ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা, আর সেই অনিশ্চয়তা যখন চরম নাটকীয়তায় রূপ নেয়, তখন জন্ম হয় এমন এক গল্পের যা যুগ যুগ ধরে ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে। আজ ১৩ই মে। ঠিক ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের এই দিনেই ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের সবচাইতে রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য সমাপ্তি। সেই মুহূর্তটি, যা আজও ভক্তদের গায়ে কাঁটা দেয়—ম্যানচেস্টার সিটির প্রথম প্রিমিয়ার লিগ জয় এবং সার্জিও আগুয়েরোর সেই ঐতিহাসিক গোল।
২০১২ সালের সেই অন্তিম দিনে শিরোপার লড়াই ছিল ম্যানচেস্টারের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের মধ্যে। ম্যানচেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—দুই দলেরই পয়েন্ট ছিল সমান ৮৬। তবে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় সিটির জন্য সমীকরণ ছিল সহজ: নিজেদের মাঠে রেলিগেশন বা অবনমন অঞ্চলে থাকা কুইনস পার্ক রেঞ্জার্সকে (কিউপিআর) হারালেই ৪৪ বছর পর ধরা দেবে আরাধ্য সেই লিগ শিরোপা। অন্যদিকে, ইউনাইটেডের প্রার্থনা ছিল সিটির পয়েন্ট হারানো এবং নিজেদের জয়।
ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুটা হয়েছিল সিটির পক্ষেই। পাবলো জাবালেতার গোলে প্রথমার্ধে লিড নেয় স্বাগতিকরা। কিন্তু বিরতির পর শুরু হয় আসল নাটক। কিউপিআরের জিব্রিল সিসে সমতা ফেরান। কিছুক্ষণ পর কিউপিআরের জোই বার্টন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে মনে হয়েছিল ১০ জনের দলের বিপক্ষে সিটি সহজেই জয় ছিনিয়ে নেবে। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে জেমি ম্যাকি গোল করে কিউপিআরকে লিড এনে দেন।
খেলার নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ। ওদিকে ইউনাইটেড তাদের ম্যাচ জিতে সিটির হারের অপেক্ষায়। গ্যালারিতে তখন কান্নার রোল, সিটির সমর্থকরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না হাতের মুঠো থেকে শিরোপা এভাবে ফসকে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত সময়ের সেই অবিশ্বাস্য ৫ মিনিট
রেফারি যখন ৫ মিনিট অতিরিক্ত সময় দিলেন, তখন সিটির প্রয়োজন ছিল দুই গোল। ৯২ মিনিটে ডেভিড সিলভার কর্নার থেকে এডিন জেকোর লক্ষ্যভেদী হেডে আশা জাগে। ব্যবধান তখন ২-২। কিন্তু তখনও দরকার একটি গোল।
ঠিক তখনই ঘটে সেই মিরাকল। ম্যাচের ঘড়িতে সময় তখন ৯৩ মিনিট ২০ সেকেন্ড। মারিও বালোতেল্লির কাছ থেকে বল পেয়ে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সার্জিও আগুয়েরো যখন বল জালে জড়ালেন, তখন ইতিহাদ স্টেডিয়ামে যেন এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল। ধারাভাষ্যকার মার্টিন টাইলারের সেই চিৎকার—"আগুয়েরোওওওও!"—ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।
অতিরিক্ত সময়ের মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখ থেকে শিরোপা কেড়ে নেয় সিটি। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ৪৪ বছরের খরা কাটিয়ে তারা ঘরে তোলে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। মার্টিন টাইলারের ভাষায়, "এমন কিছু আপনারা জীবনে আর কখনও দেখবেন না।"
আগুয়েরো ও বালোতেল্লির সেই অনন্য রেকর্ড
সিটির এই রূপকথার জয়ের মহানায়ক ছিলেন সার্জিও আগুয়েরো। নিজের প্রথম মৌসুমেই ২৩ গোল করে তিনি হয়ে ওঠেন দলের ত্রাণকর্তা। ইতিহাদ স্টেডিয়ামে তাঁর সেই জার্সি ঘোরানো উল্লাসের মূর্তিটি আজ সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষ্য দিচ্ছে। একটি মজার তথ্য হলো, ওই ম্যাচে আগুয়েরোকে দেওয়া পাসটিই ছিল মারিও বালোতেল্লির প্রিমিয়ার লিগ ক্যারিয়ারের একমাত্র এসিস্ট (সহায়তা)।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক নাটকীয় জয় আছে, কিন্তু ৯৩:২০ মিনিটের সেই জাদুর মুহূর্তটি সম্ভবত সবকিছুর উর্ধ্বে। আজ সেই ঐতিহাসিক জয়ের দিনে আরও একবার ফুটবল প্রেমীরা স্মরণ করছেন আগুয়েরোকে, স্মরণ করছেন ফুটবলীয় সেই পাগলামিকে।