বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র জগতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘অ্যাস্ট্রা ৬’ (Astra 6) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে আনল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। বিশ্বজুড়ে প্রথাগত চ্যাটভিত্তিক এআই মডেলগুলোর চেনা ছক ভেঙে এবার উন্মোচিত হলো সরাসরি কম্পিউটার পরিচালনায় সক্ষম ‘কম্পিউটার ইউজ’ প্রযুক্তি। এআই জগতের এই বৈপ্লবিক অগ্রগতি দেখে ওপেনএআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন—মানবজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করল কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা ‘এজিআই’ (AGI) যুগে।
নতুন এই মডেলটির মূল কাজের ধরণ আগের সব প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এতদিন পর্যন্ত যেকোনো কাজের নির্দেশ দিলে এআই মডেলগুলো কেবল তা বাস্তবায়নের ধাপ বা উপায় বাতলে দিত। তবে ‘অ্যাস্ট্রা ৬’ ব্যবহারকারীর নির্দেশে নিজেই কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্ক্রিনে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম। কম্পিউটার ব্যবহারের সক্ষমতা পরিমাপের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ‘ওএসওয়ার্ল্ড’ (OSWorld)-এ মডেলটি অর্জন করেছে ৭২.৬ শতাংশ স্কোর, যা পূর্ববর্তী শীর্ষ মডেল ‘জিটিপি-৫.৬ সল’ (GPT-5.6 Sol)-এর ৬৫.৭ শতাংশ স্কোরের চেয়ে অনেক এগিয়ে। শুধু সক্ষমতাই নয়, দ্রুতিতেও এসেছে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। আগের মডেল যেখানে একটি কাজ শেষ করতে গড়ে ৭৫ মিনিট সময় নিত, অ্যাস্ট্রা ৬ একই কাজ মাত্র ৪০ মিনিটে সম্পন্ন করছে।
প্রযুক্তির এই অভাবনীয় অগ্রগতির সাথে তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা। ওপেনএআই-এর নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন নির্দেশিকা (Preparedness Framework) অনুযায়ী ইতিহাসজুড়ে এই প্রথম কোনো এআই মডেলকে সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘ক্রিটিক্যাল’ (Critical) বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরীক্ষার সময় অ্যাস্ট্রা ৬ সাইবার সুরক্ষার সম্পূর্ণ অজানা দুটি ত্রুটি (Security Vulnerability) নিজে থেকেই শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এছাড়া সাইবার সিকিউরিটি পরীক্ষার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ‘এক্সপ্লয়েটবেঞ্চ’ (ExploitBench)-এ এটি ১০০ শতাংশের মধ্যে ১০০ স্কোর অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
মেধাসম্পন্ন অন্যান্য বেঞ্চমার্কেও মডেলটি অনন্য রেকর্ড গড়েছে। ফ্রন্টিয়ারম্যাথ টিয়ার ৪-এ ৯৭.৬ শতাংশ, এআরসি-এজিআই-৩ এ ৯৮.৬ শতাংশ এবং জিপিকিউএ ডায়মন্ড পরীক্ষায় এটি ৯৬ শতাংশ স্কোর লাভ করেছে। এছাড়া এর ‘কনটেক্সট উইন্ডো’ ১০ লাখ ৫০ হাজার টোকেন পর্যন্ত বিস্তৃত, অর্থাৎ এটি একটি আস্ত বইয়ের সিরিজ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।
তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই সুবিধা এখনই উন্মুক্ত হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ওপেনএআই-এর ‘ট্রাস্টেড অ্যাক্সেস’ এবং ‘ডেব্রেক’ প্রোগামের অন্তর্ভুক্ত নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। পরবর্তী ধাপে চ্যাটজিপিটি প্লাস, প্রো, বিজনেস, এন্টারপ্রাইজ, এপিআই সহ এডব্লিউএস (AWS) এবং অ্যাজিউর (Azure) প্ল্যাটফর্মে এটি পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হবে। এপিআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ লাখ ইনপুট টোকেনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ ডলার এবং আউটপুট টোকেনের মূল্য ৫০ ডলার। এছাড়া সাধারণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার খাতিরে মডেলটি যেকোনো ধরনের জটিল সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত কাজের অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সিস্টেমটির একক পারফরম্যান্সের পেছনে মূল চাবিকাঠি শুধু মডেলটি নিজে নয়, বরং এর পুরো ‘এজেন্ট সিস্টেম’। উদাহরণস্বরূপ, এআরসি প্রাইজ টিমের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এআরসি-এজিআই-৩ টেস্টে পূর্বে এনভিডিয়ার (NVIDIA) ‘এভিও’ আর্কিটেকচারভিত্তিক সিস্টেমও ক্লড ওপাস ৫-এর সমন্বয়ে শতভাগ স্কোর অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। ফলে এই বিপুল সক্ষমতা মূলত উন্নত অ্যালগরিদম ও পারিপার্শ্বিক এআই ইকোসিস্টেমের এক সম্মিলিত যৌথ সফলতা।