ধ্রুব ডেস্ক
বিজ্ঞান অনেক সময়ই প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে ফেলার গল্প শোনায়, তবে কিছু গল্প এতটাই রোমাঞ্চকর যে তা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। এমনই এক অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৪ সালে। যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত এক ভুল ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিতে একজন তরুণ চিকিৎসক নিজেই নিজের শরীরে প্রবেশ করিয়েছিলেন এক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া।
প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই
সে সময় বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মানসিক চাপ (স্ট্রেস), অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার কিংবা পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডের কারণেই আলসার বা ক্ষত তৈরি হয়। পাকস্থলীর ভেতরের তীব্র অম্লীয় বা অ্যাসিডিক পরিবেশে কোনো ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে—এমন ধারণা তৎকালীন সময়ে ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অবিশ্বাস্য।
ঠিক সেই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার একজন তরুণ চিকিৎসক ব্যারি মার্শাল এবং প্যাথলজিস্ট রবিন ওয়ারেন এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলেন। তারা আলসার আক্রান্ত রোগীদের পাকস্থলীর বায়োপসি (টিস্যু পরীক্ষা) করতে গিয়ে বারবার এক ধরনের বাঁকানো ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখতে পান। পরবর্তীতে এই ব্যাকটেরিয়ার নাম দেওয়া হয় হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি (এইচ. পাইলোরি)।
নিজের শরীরেই পরীক্ষা: এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত
মার্শাল ও ওয়ারেন দাবি করলেন, এই ব্যাকটেরিয়াই আলসারের মূল কারণ। কিন্তু তৎকালীন রক্ষণশীল চিকিৎসা সমাজ এই নতুন তত্ত্বকে পাত্তাই দিতে চাইল না। সবাই তাদের দাবিকে হেসেই উড়িয়ে দিল। কোনো উপায় না দেখে, নিজের তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য ব্যারি মার্শাল এক চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিলেন।
তিনি ল্যাবরেটরির একটি পাত্র (পেট্রি ডিশ) থেকে বিপুল পরিমাণ ‘হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি’ ব্যাকটেরিয়াযুক্ত তরল সরাসরি পান করে ফেললেন! নিজের সুস্থ শরীরকে পরিণত করলেন গবেষণাগারে।
কী ঘটেছিল তারপর?
ব্যাকটেরিয়াভর্তি সেই তরল পানের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই মার্শালের শরীরে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। তার তীব্র পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং মুখে প্রচণ্ড দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এরপর যখন তার পাকস্থলীর এন্ডোস্কোপি করা হয়, তখন দেখা যায় তার পাকস্থলীতে তীব্র প্রদাহ (গ্যাস্ট্রাইটিস) তৈরি হয়েছে এবং সেখানে সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো বংশবৃদ্ধি করেছে। এই দুঃসাহসী পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো যে, আলসার বা গ্যাস্ট্রাইটিসের আসল অপরাধী কোনো মানসিক চাপ বা ঝাল খাবার নয়, বরং এই ব্যাকটেরিয়া।
কীভাবে পাকস্থলীতে টিকে থাকে এই ব্যাকটেরিয়া?
পাকস্থলীর তীব্র অ্যাসিডকেও ফাঁকি দেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে হেলিকোব্যাকটার পাইলোরির। এটি নিজের শরীরে ইউরেজ নামের একটি বিশেষ এনজাইম বা জারক রস তৈরি করে। এই ইউরেজ পাকস্থলীর ইউরিয়াকে ভেঙে অ্যামোনিয়া তৈরি করে। ক্ষারীয় প্রকৃতির এই অ্যামোনিয়া ব্যাকটেরিয়াটির চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে পাকস্থলীর অ্যাসিডকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
এরপর ব্যাকটেরিয়াটি পাকস্থলীর ভেতরের সুরক্ষিত মিউকাস বা শ্লেষ্মা স্তরে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে। যা থেকে পরবর্তীতে গ্যাস্ট্রাইটিস, পেপটিক আলসার, এমনকি পাকস্থলীর ক্যানসারের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
চিকিৎসার নতুন দিগন্ত ও নোবেল প্রাপ্তি
ব্যারি মার্শালের এই আত্মত্যাগের ফলে আলসারের চিকিৎসায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বর্তমানে এই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে ‘ট্রিপল থেরাপি’ ব্যবহার করা হয়। এই চিকিৎসায় রোগীকে ১০ থেকে ১৪ দিন ধরে একটি প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর ওষুধ) এবং দুটি অ্যান্টিবায়োটিক—সাধারণত অ্যামোক্সিসিলিন ও ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন একসাথে দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়াটি শরীর থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়।
একজন চিকিৎসকের নিজের শরীরের ওপর চালানো এই বিপজ্জনক ও সাহসী পরীক্ষা চিরতরে বদলে দিয়েছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ্যবই। চিকিৎসাজগতে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে ব্যারি মার্শাল এবং রবিন ওয়ারেন—দুজনেই যৌথভাবে লাভ করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মান ‘নোবেল পুরস্কার’।