ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
ছবি: ফোকাস বাংলা
স্থানীয় দুটি সংগঠনের হঠাৎ অবরোধ এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞায় দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি এখন পুরোপুরি পর্যটকশূন্য। বছরের এই ভরা পর্যটন মৌসুমে আতিথেয়তা খাত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাজেক ভ্রমণে কড়াকড়ি ও স্থবিরতার কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক কোটি টাকার ব্যবসা মার খাচ্ছে।
সাজেক কটেজ-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ওই এলাকায় মোট ১২০টি কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে। পর্যটনের শীর্ষ এই সময়ে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সব রুমই অগ্রিম বুকিং করা ছিল। কিন্তু আকস্মিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে রিসোর্ট মালিকদের অগ্রিম বুকিংয়ের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। কেবল থাকার জায়গা নয়, পর্যটকদের যাতায়াত, রেস্তোরাঁর খাবার, পানি সরবরাহসহ সাজেকের পুরো স্থানীয় অর্থনীতিই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অচলাবস্থায় একের পর এক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিপাকে পড়েছেন শত শত কর্মী।
সমস্যার তীব্রতা তুলে ধরে কটেজ-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন জানান, অধিকাংশ ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে কটেজ ও রিসোর্ট তৈরি করেছেন। পর্যটন বন্ধ থাকায় ব্যবসা থেকে কোনো আয় আসছে না, অথচ ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত থাকায় দ্রুত এই সংকটের একটি স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দাবি করেন তিনি।
একই সুর সাজেক হিলভিউ রিসোর্টের মালিক ইন্দ্র চাকমার কণ্ঠেও। তিনি জানান, আগামী ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর রিসোর্টের সব কক্ষ বুকড ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সব টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। বিগত মাত্র ১০ দিনেই তাঁর প্রতিষ্ঠান চার লাখ টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
মূলত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে সড়কপথে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সাজেক এলাকা থেকে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ, সাধারণ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে তল্লাশি বন্ধ এবং স্থানীয়দের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকা। প্রশাসনের সাথে আলোচনার পর সাময়িকভাবে অবরোধ স্থগিত করা হলেও দাবি আদায় না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার থেকে পুনরায় রাজপথে নামে সংগঠন দুটি।
অবরোধের কারণে সাজেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সুরক্ষায় তাঁদের নিরাপদে খাগড়াছড়ির দিকে নিয়ে আসা হয়। পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার সময় বাঘাইছড়ি উপজেলার গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে গোলাগুলি শুরু হলে সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্য ও দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশ প্রশাসনের দাবি, ওই গোলাগুলির ঘটনায় আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ জড়িত ছিল। যদিও ইউপিডিএফ এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তবে সংঘর্ষের পর থেকেই উজোবাজার ও আশপাশের সাধারণ বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছেন। এলাকাটিতে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
সাজেকের পর্যটন ব্যবসা সচল করা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকরা। পার্বত্য যানবাহন সমিতির সভাপতি আইয়ূশ চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তারা বলেন, পাহাড়ে চাঁদাবাজি বন্ধ করে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং অবিলম্বে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। দাবি মেনে নেওয়ার জন্য তারা প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা (আলটিমেটাম) বেঁধে দিয়েছেন, অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির হুমকি দেন।
অন্যদিকে, সাজেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলা, লাঠিপেটা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের দাবির সমর্থনে আজ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে 'ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ'। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় পুরো পার্বত্য অঞ্চলে থমথমে আবহাওয়া ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।