Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যশোর আইটি পার্ক: প্রযুক্তির আড়ালে অনৈতিকতার ফাঁদ

তহীদ মনি তহীদ মনি
প্রকাশ : রবিবার, ২৩ আগস্ট,২০২৬, ১১:৫৮ পিএম
যশোর আইটি পার্ক: প্রযুক্তির আড়ালে অনৈতিকতার ফাঁদ

ছবি: সংগৃহীত

বাইরে ঝকঝকে প্রযুক্তির কেন্দ্র, কিন্তু ভেতরে অনৈতিকতার হাতছানি। যশোর আইটি পার্কের ডরমেটরি সাব-লিজ দেওয়ার পর থেকেই সেখানে বিস্তার ঘটেছে মদ, নারী ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তরুণেরা যেখানে আগামীর পথ খোঁজার কথা, সেখানে নিত্যদিন বাড়ছে অনৈতিক ফাঁদে  পড়া নারীর সংখ্যা। ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যশোর আইটি পার্ক তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অসামাজিক আস্তানায় পরিণত হয়েছে। স্পা, ডরমেটরি ও রেস্টুরেন্টের নামে চলা অনৈতিক ব্যবসা ও তরুণীদের ব্ল্যাকমেইলিং  এতটাই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ সচিবালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল গতকাল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই আইটি পার্কটি নির্মিত হয়। আইটি পার্কের মূল একাডেমিক ভবন ছাড়াও একটি নান্দনিক ক্যাফেটেরিয়া এবং অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত একটি ডরমেটরি নির্মাণ করা হয়। শুরুতে হাইটেক পার্ক অথরিটির অধীনে পার্কের কার্যক্রম শুরু হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে এই পার্কটি একটি  কোম্পানিকে লিজ প্রদান করে তৎকালীন সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিশ্বস্ত বন্ধুর প্রতিষ্ঠান টেকসিটি কোম্পানি এই আইটি পার্কের লিজগ্রহীতা হিসেবে পার্কের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বন্ধুর প্রতিষ্ঠান, তাই অনেকেই মুখ বুজে কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে পার্কের উদ্বোধনের সময় যে সকল সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল তার লেশমাত্র না থাকায় এই পার্কের ইনভেস্টররা ব্যাপক আর্থিক ও ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অথচ সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মিত এই পার্কটি লুটপাট করে ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করতে থাকে টেকসিটি। যার কারণে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি একটি বেসরকারি কোম্পানির ট্রেনিং সেন্টার ও হোটেল ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে আইটি পার্কের ডরমেটরিটি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য টেকসিটি কোম্পানি সম্পূর্ণ নিয়ম ভেঙে খান প্রোপার্টিজ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে সাব-লিজ প্রদান করে।

খান প্রোপার্টিজ সাব-লিজ নেওয়ার পর থেকে এই হোটেলটিতে বার ও স্পা সেন্টার খুলে ব্যবসা শুরু করে।  এই সময় বিস্তার লাভ করে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের।

জুলাই বিপ্লবের পর জনরোষের কারণে খান প্রোপার্টিজ কোম্পানি হোটেলটি বন্ধ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু কিছুদিন বন্ধ রাখার পর ফের নতুন উদ্যমে তারা চালু করে হোটেলটি। জুলাই বিপ্লবের পরে বাইরে যখন নিরাপত্তাহীনতা কাজ করত, তখন যশোর আইটি পার্কের মতো একটি সরকারি নিরাপত্তা বলয়ের এই হোটেলটিতে নিশ্চিন্তে চলে অনৈতিক কাজ। একপর্যায়ে গত জানুয়ারি মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে খান প্রোপার্টিজ বিদায় নিলেও থামেনি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি।

চলতি বছরের মার্চ মাসে ক্রাউন কমফোর্টিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান হাইটেক পার্ক অথরিটির কাছ থেকে বিভিন্ন শর্তে এই হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টটি লিজ নেয়। সব নিয়ম মেনে তারা মার্চ মাসের শেষের দিকে হোটেলটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সরকারের নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এই হোটেলটিতে আবারও নানা অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা হচ্ছে  বলে একাধিক অভিযোগে প্রকাশ পাচ্ছে।

একাধিক অভিযোগ দিয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিচার প্রার্থনা করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। আর এরকম একাধিক অভিযোগের কারণেই গতকাল বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের।

সম্প্রতি যশোরের জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এরকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডের একাধিক ভিডিও ক্লিপ নানা সোর্স থেকে হস্তগত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন সেখানে অভিযান দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল বলেও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক সূত্র জানায়। কিন্তু এতে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে মনে করে এ পথে যায়নি তারা। তবে ওই সূত্র জানায়, ভিডিও ক্লিপ দেখে কষ্ট বেড়েছে, ছোট ছোট স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের যেভাবে ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ফেলে ক্ষতির মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, আইটি পার্ক একবার ঘুরতে যাওয়ার শখ প্রায় সবারই আছে, বিশেষ করে সেখানে যেভাবে নানা নিয়ম মেনে যেতে হয়। ফলে বেড়ানোর নাম করে বা নাস্তা করানোর নাম করে তাদের সাথী, বন্ধু বা সহপাঠীরা তাদের ওই হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে গিয়ে জোর করে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছে। এইসব কুকর্মের সাথে হোটেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পরস্পর যোগসাজশে যুক্ত। অনেক সময় হোটেল রুমের বেডের এসব দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে তরুণী/শিক্ষার্থী বা গৃহবধূদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। সামাজিকতা ও মান-সম্মানের কথা ভেবে ইতোমধ্যে কয়েকজন তরুণী আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জেলা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান।

এদিকে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসন এই বিষয়টি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় নির্ধারণে হাইটেক পার্ক অথরিটির সাথেও যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে গতকাল রোববার বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টিম যশোর আইটি পার্ক ও হোটেলটি পরিদর্শন করেন। টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সচিব মিজ্ নাসরীন জাহান। পরিদর্শন টিমটি গতকাল সরেজমিনে আইটি পার্ক, আইটি পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং ক্যাফেটেরিয়া পরিদর্শন করেন এবং হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার কামাল হোসেন, সিইও মাহবুব আলম, ম্যানেজার অপারেশন আসলাম হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে হোটেলের জিএম কামাল হোসেন বলেন, ‘উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে হাইটেক পার্ক অথরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্যার আমাদের সাথে কথা বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। আমরা স্যারকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’

সিইও মাহবুব আলম বলেন, ‘যেসব ভিডিও বা অন্য সব অনৈতিকতার বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে তা মনে হয় বর্তমান সময়ের নয়, বিগত বছরগুলোর। তারপরও আমরা হোটেল কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে নিয়ে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছে এই ধরনের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন এবং দুই-একটি ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে তারা খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েন। অনেকে নানা রকম ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন। আমরা নিজস্ব সোর্স দিয়ে এসব ঘটনার সত্যতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের একাধিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর বা অভিযোগ আমার দপ্তরেও এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। বিষয়টি তদন্তের কথাও বলেছি।’ এসব প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আরও জানান, আগে এসব অনৈতিক বিষয়ের গুরুত্বসহ তদন্ত জরুরি। তারপর প্রায়শই চাল-ডাল কোম্পানির কর্মচারীদের আন্দোলন ও সমস্যা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। কোম্পানিটিরও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতির খবর পাচ্ছি।

পরিদর্শন টিমের প্রধান হাইটেক পার্ক অথরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই বেদনাদায়ক। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এরকম এক বা একাধিক অভিযোগ প্রাপ্ত হয়ে ঘটনাটি সরেজমিনে দেখতে যশোরে গিয়েছিলাম। আইটি পার্ক ঘুরে দেখেছি। হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য দ্রুতই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে’ বলে তিনি ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করেন।

 

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)