ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ছয় মাস পর কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্স খুলে পাওয়া গেছে ৪৩ বস্তা টাকা। ছয় মাস পর আজ শনিবার সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে দানসিন্দুকগুলো খোলা হয়। এরপর থেকে চলছে গণনা।
টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছেন, রূপালী ব্যাংকের প্রায় একশ কর্মকর্তা-কর্মচারী, আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া ও পাগলা মসজিদের এতিমখানাসহ দুটি মাদরাসার প্রায় সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থী, মসজিদ কমিটির সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সরেজমিন মসজিদের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, বস্তা থেকে টাকা নিয়ে গোছানোর কাজ করছেন মাদরাসার ছাত্ররা।
পরে বান্ডিলগুলো ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ব্যাংকের কর্মীরা মেশিনের সাহায্যে টাকা গণনা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দীর্ঘ ছয় মাস পর দানসিন্দুক খোলা হওয়ায় এবার প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জেলা প্রশাসক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গণনার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গণনার কাজ তদারকি করছেন।
রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারিছি জানান, এবারও নগদ অর্থের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রা এবং সোনা-রূপার অলঙ্কার পাওয়া গেছে। টাকাগুলো গণনা শেষ করতে সন্ধ্যা কিংবা রাত হয়ে যেতে পারে। দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনার পুরো কার্যক্রম ঘিরে মসজিদ এলাকায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, ‘দানবাক্স বা সিন্দুক খোলা থেকে শুরু করে টাকা গণনা এবং ব্যাংকে জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু গণনার দিন নয়, সারা বছরই দানসিন্দুকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।’
কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা মসজিদে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ নিয়মিত দান করতে আসেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ নানা ধরনের জিনিসও এখানে দান করা হয়। তবে সোনা-রূপার অলঙ্কার ও অন্যান্য সামগ্রী আলাদাভাবে হিসাব করা হয়।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, মসজিদের আয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে বাকি অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হচ্ছে। বর্তমানে সরাসরি দানের শত কোটিরও বেশি টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সংরক্ষিত আছে। সময়-সুযোগ অনুযায়ী এগুলো প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হবে।
তিনি আরো জানান, পাগলা মসজিদের জমাকৃত অর্থ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও এ অর্থ ব্যয় করা হয়।
জেলা প্রশাসক জানান, এই অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা হবে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স। প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত নকশা হাতে পেলেই দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং এরপরই শুরু হবে নির্মাণকাজ।
এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর তিন মাস ২৭ দিন পর দানসিন্দুক খোলা হয়েছিল। তখন পাওয়া যায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। তারও আগে একই বছরের ৩০ আগস্ট চার মাস ১৮ দিন পর দানসিন্দুক খুলে পাওয়া যায় ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা। ওই সময় নগদ অর্থের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা, সোনার গয়না ও হিরাও পাওয়া গিয়েছিল। এবার ছয় মাস পর দানসিন্দুক খোলায় স্বাভাবিকভাবেই দানের পরিমাণ আরো বেশি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দানসিন্দুক থেকে টাকা বের করে বস্তায় ভরতে ৪৩টি বস্তার প্রয়োজন হয়েছে।
জানা গেছে, পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে ১০ তলাবিশিষ্ট ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মিত হলে একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি নারী মুসল্লিদের জন্য আলাদা নামাজের স্থান, এতিমদের শিক্ষাব্যবস্থা, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া ও আইটি সেকশনসহ নানা আধুনিক সুবিধা থাকবে।