ধ্রুব ডেস্ক
ফেরিতে যানবাহন ওঠানোর আগে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে প্রতিপালন করায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিশ্চিত প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন ৩৭ জন বাসযাত্রী। আজ শুক্রবার (৫ জুন) সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ৭ নম্বর ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তবে ঘটনার আগেই যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। দুর্ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ নদী থেকে বাসটি টেনে তুলতে সক্ষম হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী আরিফ বিল্লাহ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফেরিতে যানবাহন ওঠানোর আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার নিরাপত্তা নির্দেশনাটি কঠোরভাবে অনুসরণ করার ফলেই আজ এক বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ফেরিঘাটে দুর্ঘটনা এড়াতে এই নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য আবারও সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার মদনপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা এসবি পরিবহনের বাসটিতে ৩৭ জন যাত্রী এবং চালক-সহকারীসহ মোট ৪০ জনের মতো আরোহী ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে পৌঁছালে নিয়ম অনুযায়ী হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রথমে অনেক যাত্রী নামতে না চাইলে নৌ পুলিশ ও ঘাট কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়ে জোরপূর্বক তাদের বাস থেকে নামিয়ে দেয়। যাত্রীরা নামার পরপরই চালক ও সহকারী বাসটি নিয়ে কে-টাইপ ফেরি ‘করবী’-তে ওঠার চেষ্টা করেন। এ সময় বাসটি হঠাৎ ব্রেক ফেল করে নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং ফেরির বিপরীত পাশের র্যাম ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়।
বাসের জানালা দিয়ে অলৌকিকভাবে বের হয়ে আসা আহত চালক ঝন্টু আলী (৪৮) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বলেন, "যাত্রীদের নামানোর পর ফেরিতে ওঠার জন্য গাড়ি চালু করতেই ব্রেক ফেল করে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে করবী ফেরির র্যামে আঘাত করে নদীতে পড়ে যায়।"
বাসের যাত্রী নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আবদুস সালাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "আমি প্রথমে বাস থেকে নামতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে নৌ পুলিশ আমাদের জোর করে নামিয়ে দেয়। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি নদীতে পড়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন।"
দুর্ঘটনার পর পরই বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। নদী থেকে চালক ঝন্টু আলী ও তার সহকারীকে জীবিত উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। পরবর্তীতে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ এসে দুপুর ১২টার দিকে ডুবে যাওয়া বাসটি টেনে ঘাটে থাকা ফেরি করবীর ওপর তোলে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন। তিনি বলেন, "সবার সচেতনতা এবং নিয়ম মানার কারণেই আজ এতগুলো প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ থেকে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া বাসে থাকা যাত্রীদের মালামাল উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস একইভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন। আজকের ঘটনার পর ঘাট এলাকায় নিরাপত্তাবিধি মানার বিষয়ে সাধারণ যাত্রী ও চালকদের মধ্যে বাড়তি সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে।
দৌলতদিয়ায় ৬ ঘণ্টা পর ফের যানবাহন পারাপার শুরু
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী একটি বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রায় ৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পুনরায় যানবাহন পারাপার শুরু হয়েছে।