ধ্রুব ডেস্ক
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। আজ সকালে তোলা ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে শুরু হয়েছে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সমন্বিত অভিযান। আজ সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য এই ‘মহা-অভিযানে’ অংশ নিয়েছেন। তবে যৌথ বাহিনীকে রুখতে সন্ত্রাসীরা রাস্তার ওপর ট্রাকের ব্যারিকেড দেওয়া, কালভার্ট ভেঙে ফেলা এবং নালার স্ল্যাব তুলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।
অভিযানে বাধা ও সন্ত্রাসীদের আগাম প্রস্তুতি যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, অভিযানের খবর আগেভাগেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে রোববার রাতেই আলীনগর প্রবেশের মূল রাস্তায় একটি বড় ট্রাক আড়াআড়িভাবে রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এছাড়া একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয় এবং নালার স্ল্যাব উপড়ে ফেলা হয় যাতে ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে। তবে অকুতোভয় যৌথ বাহিনী ট্রাক সরিয়ে এবং ইট-বালি দিয়ে ভাঙা কালভার্ট ভরাট করে দুর্গম পাহাড়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, "জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সিএনজি চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে তারা অভিযানের খবর জেনে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছিল। তবে সব বাধা সরিয়ে বাহিনী এখন আলীনগরের ভেতরে অবস্থান করছে।"
জঙ্গল সলিমপুরে মূলত দুটি পক্ষ সক্রিয়। একটির নেতৃত্বে রয়েছে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটি নিয়ন্ত্রণ করে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে র্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যার মামলার প্রধান আসামি। আলীনগর এলাকায় ইয়াসিনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মূলত তাকে ও তার সশস্ত্র বাহিনীকে ধরতেই এই চিরুনি অভিযান। জঙ্গল সলিমপুরের ৩ হাজার ১০০ একর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বসানো হয়েছে কড়া তল্লাশি চৌকি।
গত জানুয়ারি মাসে আসামি ধরতে গিয়ে ইয়াসিন বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় এক র্যাব কর্মকর্তা নিহত হন। সেই সময় চার র্যাব সদস্যকে অপহরণও করা হয়েছিল, যাদের পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার করে। ওই ঘটনার পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা ছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তখন তা পিছিয়ে যায়। ৪ দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এই কয়েক হাজার অবৈধ বসতি এখন সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। এখানে পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখতে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে অপরাধীরা।
রাজনৈতিক ভোলবদল ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ত্রাসী ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। তবে ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করতে শুরু করেন। যদিও বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং এসকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই।
অস্থায়ী ক্যাম্পের পরিকল্পনা পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল হাসান আরও জানান, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী ক্যাম্প করার পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে এই দুর্গম এলাকা আর সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত কত অস্ত্র উদ্ধার বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
বর্তমানে ডগ স্কোয়াড, ড্রোন এবং ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে নজরদারি চালিয়ে এলাকাটি তল্লাশি করা হচ্ছে। নিরাপত্তার খাতিরে সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।