ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। শেখ হাসিনার সরকারকে কীভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে তা ঠিক হয়েছিল এ দিনেই। চূড়ান্ত বিজয়ের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত। দিনটি ছিল কারফিউ, গুলি আর রক্তে রাঙা। রাস্তায় ছাত্র-জনতা, সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলন চলে। তীব্র ক্ষোভ আর বিক্ষোভে উত্তাল বাংলাদেশ। রাজধানী থেকে মফস্সল সর্বত্রই এক দাবির প্রতিধ্বনি ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ।’ দেশ জুড়ে অসহযোগ আন্দোলনে বন্ধ ছিল দোকানপাট ও যান চলাচল।
পুলিশের পাশাপাশি এদিন মাঠে নামে আওয়ামী লীগের বাহিনীও। মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। বন্ধ ছিল ফেসবুক—হোয়াটসঅ্যাপও। দিনভর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নজিরবিহীন সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলোর ঘটনায় সারা দেশে নিহত হন ৯৮ জন। চারদিকে নিহত পরিবারগুলোর আহাজারি যেন সেদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল ক্ষমতার মসনদ। এমন অবস্থার মধ্যে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তী সময় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন সর্বমহলের মানুষ।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের গণজমায়েতে তত্কালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আগামী ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করা হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন মাঝখানে দুই দিনের (৪ ও ৫ আগস্ট) আলটিমেটাম দেয় সরকারকে। এর মধ্যে দাবি মানা না হলে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করা হবে। কিন্তু ৪ আগস্ট ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং অনেক প্রাণহানি ঘটে। এতে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং প্রতিবাদ জানায়। কোথাও কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ায়। ফলে পরিস্থিতি পালটে যায়। তবে রাত ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা করেন—পরশু নয়, আগামীকালই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। এর পর আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলমও ফেসবুক পোস্টে ঘোষণা দেন—পরশু নয়, কালকেই ‘লং মার্চ টু ঢাকা!’ এর কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেন, আগামীকালই ‘মার্চ টু ঢাকা’। ইতিহাসের সাক্ষী ও চূড়ান্ত লড়াইয়ে শামিল হতে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করুন এখনই।’
এদিকে সশস্ত্র বাহিনীকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না দাঁড়ানোর আহ্বান জানায় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, বাংলাদেশে চলমান ‘বেদনাদায়ক’ সহিংসতা দ্রুত বন্ধ করতে বিবৃতি দেয় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের প্রধান ফলকার তুর্ক। তিনি সেনাপ্রধানের উদ্দেশে একটি চিঠিও লেখেন। যে যাই বলুক না কেন—চূড়ান্ত বিজয়ের টার্নিং পয়েন্ট ছিল এই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত। কিন্তু কেন একদিন এগিয়ে আনা হয়েছিল? এখন পর্যন্ত তা কেউ জানতে পারেনি। ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একাধিক সমন্বয়ক, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসলে সেই রহস্যটা কী ছিল।
৩ আগস্ট যখন ঘোষণা করা হয়, ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। ঠিক তখন থেকেই সরকার চাপে পড়ে যায়। কর্মসূচি নস্যাত্ করতে সব ধরনের পরিকল্পনা শুরু করে। চার আগস্ট গণভবনে রাতভর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সব জেলা থেকে পুলিশ ফোর্স ঢাকায় আনা হবে। এছাড়া র্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও সেনাবাহিনী কীভাবে কাজ করবে তার একটি নকশা তৈরি করা হয়। আকাশে বিমান কীভাবে কাজ করবে তাও পরিকল্পনায় আনা হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ঢাকা মহানগরীর পাশাপাশি বাইরের নেতারা এসে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে তার চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী এসে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে থেকে ছাত্র-জনতাকে মোকাবিলা করতে পারে তাও চূড়ান্ত করা হয়। সরকারের মূল পরিকল্পনা ছিল, যে কোনো মূল্যে ঢাকা সামাল দিতে হবে। কিন্তু বিষয়টি টের পেয়ে যায় প্রশাসনে থাকা সরকারবিরোধী কর্মকর্তারা। তারা বিষয়টি আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের জানিয়ে দেয়। তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনতে হবে। এতে সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা নস্যাত্ হবে। কথা অনুযায়ী কাজ। এর পর ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট ঘোষণা করা হয়।
৪ আগস্ট রাতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা নিয়ে কেউ কেউ দ্বিধাবিভক্তির খবর ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল। এ বিষয়ে তত্কালীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা এটা ছড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমন্বয়কদের নামে এসব ছড়ালে সাংবাদিক ও পাবলিক বিশ্বাস করবে না। জনগণও বিভক্ত হয়ে যাবে। তখন আন্দোলন সফল হবে না। তাছাড়া কিছু সাংবাদিকও (যারা সরকারকে খুবই পছন্দ করতেন) রয়েছেন যারা এই দ্বিধাবিভক্তিতে জড়িত ছিলেন।’
এদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। সড়কে অবস্থান নেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীরও ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শিল্পাঞ্চল, জেলা ও উপজেলা সদরে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবত্ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরদিন ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কারফিউয়ের মধ্যে সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইনের আলোকে তার প্রতিশ্রুত দায়িত্ব পালন করবে। গণভবনে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বৈঠক শেষে নৈরাজ্যবাদীদের দমন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন যারা নাশকতা করছে, তারা কেউই ছাত্র নয়; তারা সন্ত্রাসী।’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘জঙ্গি হামলা’ হচ্ছে জানিয়ে সতর্ক করে সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবক সবাইকে নিরাপদে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। জঙ্গি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এদিন আবারও বন্ধ করা হয় মোবাইল ইন্টারনেট। গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এদিন দুপুর ১২টার পর সরকারি একটি সংস্থার নির্দেশে ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়। সেই সঙ্গে মেটার প্ল্যাটফরম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধের নির্দেশ দেয় সরকারি একটি সংস্থা। দেশের অন্তত ৩৮টি জেলায় জনপ্রতিনিধিদের বাসা, আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও থানাসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়। ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল সারা দেশ থেকে। গণপরিবহন চলাচল ছিল না বললেই চলে। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ছেড়ে যায়নি। অনেকটা রাজধানীর মতোই চিত্র ছিল দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে। সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সিরাজগঞ্জ। সংঘর্ষ ও মারধরে ১৩ পুলিশ সদস্যসহ ২৩ জনের মৃত্যু হয়।
এদিকে রাজধানীর রাওয়া ক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে সামরিক বাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনসহ সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব পেশ করে। এতে শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া চালুর আহ্বান জানানো হয়। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ওইদিন দুপুর ১টার দিকে ঘোষণা আসে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সবার ধারণা ছিল ২০০৭ সালের মতো এবারও সেনাশাসন আসছে। তবে পরবর্তী সময়ে সেনাকুঞ্জে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সব রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে আলাপ-আলোচনা করে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা দেওয়া হয়। যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ৮ আগস্ট।
এর আগে ৫ আগস্ট সকালের দিকে সেনাপ্রধানের ভাষণের কথা শুনে উত্তরা দিয়ে জনস্রোত প্রবেশ করতে থাকে ঢাকায়। যাত্রাবাড়ী দিয়েও লাখো জনতা স্রোতের মতো প্রবেশ করে। শেখ হাসিনা ভারতে গেছে এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ঢাকাবাসী সড়কে নেমে আসে। আবালবৃদ্ধবণিতা অলিগলি আর সড়কে উল্লাসে মাতে। খুশিতে উদ্যাপন করে ১৫ বছরের অপশাসনের গ্লানি। সবাই মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে থাকে। কেউ গণভবনে গিয়ে সিজদায় নত হয়। স্বৈরাচার পালানোর খুশিতে গণভবনের সম্পদ যেন অনেকে নিজের করে নেয়। যে যা পারে তাই স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য অনেকেই গণভবনের অনেক কিছু ফেরত দিয়ে গেছে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। তবে ঝরে যায় সহস্রাধিক প্রাণ। আহত হন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। এই আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই। আর শেষ হয় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বধীন সরকার পতনের মধ্য দিয়ে। যা ছিল দীর্ঘ ৩৬ দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল।