ছবি: সংগৃহীত
গত ১জুন থেকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর আজ থেকে বাড়বে বিদ্যুতের দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ বুধবার বিকালে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করবে। ফলে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। পাইকারিতে ১৯ শতাংশের মতো বাড়তে পারে। আর খুচরায় (গ্রাহক পর্যায়ে) সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মতো বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় কথা বিদ্যুতের দাম ১ জুন থেকে কার্যকর হবে। ফলে গ্রাহকদের জুলাই মাসে সে দাম পরিশোধ করতে হবে। বিইআরসি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মাত্র কিছুদিন আগে গত ২০ এবং ২১ মে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি। শুনানি গ্রহণের পর মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে নতুন দাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি এক দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে এক দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর আবেদন করে। দাম বাড়ানোর আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২ দশমিক ৯১ টাকা। চলমান এ দামে বিক্রি করলে, পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
এর আগে পিডিবির প্রস্তাবের বরাত দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগও একটি চিঠি দেয় বিইআরসিকে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় বাবদ মোট ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৭ দশমিক এক মিলিয়ন টাকা রাজস্ব চাহিদার বিবেচনায় প্রতি ইউনিটে গড় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় হবে ১২ দশমিক ৯১ টাকা। বিদ্যমান ট্যারিফে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় হবে সাত লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৮ দশমিক চার মিলিয়ন টাকা। এতে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি হবে ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৮ দশমিক সাত মিলিয়ন টাকা। এ ঘাটতি পূরণে গড় বিক্রয়মূল্য ইউনিটপ্রতি এক দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি করলে ঘাটতি হ্রাস পাবে ১৩ হাজার ২৯৮ দশমিক ১৬ কোটি টাকা এবং ইউনিটপ্রতি এক দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) বৃদ্ধি করলে ঘাটতি হ্রাস পাবে ১৬ হাজার ৬৬২ দশমিক ৭০ কোটি টাকা।
গণশুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির সদস্য মো. আবদুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান, অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শাহীদ সারওয়ার। ওই সভায় একই সঙ্গে দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণিভেদে ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে শুনানিতে ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজুর রহমান বলেন, জনগণের অবস্থা বিবেচনা করলে এখানে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তো দূরের কথা শুনানির আয়োজনই করার কথা নয়। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে এ শিক্ষাবিদ বলেন, বিইআরসি দেশের ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। বিদ্যুৎ খাত থেকে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে।
এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে তাদের টাকা দিচ্ছে সরকার। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। সবার আগে উচিত বিদ্যুৎ খাতের লুটেরাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
এদিকে,বর্তমান সরকারের সময়ে বিদ্যুতের ওপর থেকে ভর্তুকির চাপ কমানোর লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলো শুনানির শুরুতেই পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পিডিবি। এ প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি ছিল, বিদ্যুৎ খাতে চলতি অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ৬২ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরেও ঘাটতির এ ধারা বহাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এমন অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে হলে দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। দাম না বাড়লে বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ প্রক্রিয়ার প্রবল বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা। তাদের মতে, এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা হবে। তারা বলেন, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হবে নিম্নআয়ের মানুষ।
তবে অংশগ্রহণকারী সকল পর্যায়ের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর পক্ষে মত দেয়া হয়।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলেন, বিইআরসি একটি গণবিরোধী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সরকার দাম বাড়াতে চায় আর বিইআরসি সেটাই বাস্তবায়ন করে। শুনানি একটি আইওয়াশ মাত্র। গণশত্রুতে পরিণত না হওয়ার আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করে শুনানি কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, এই মুহূর্তে দাম বাড়ালে সেটা হবে আমাদের জন্য হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এখন দাম বাড়ালে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে। ব্যবসায়ীদের এ নেতা বলেন, এক সময় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়ানোর সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ছয় দশমিক ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাত দশমিক চার টাকা করা হয়।
ধ্রুব/টিএম