ধ্রুব ডেস্ক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। আজ মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। ছবি: জাতিসংঘের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘে দেওয়া প্রথম বক্তব্যে বৈশ্বিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে ছয়টি কর্মস্তম্ভভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) জাতিসংঘে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের আস্থা ও সমর্থনের কারণেই তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন।
তিনি এই দায়িত্বকে বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করছেন বলে উল্লেখ করেন। ড. খলিলুর রহমান এ সময় তাকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান।
পাশাপাশি প্রচারণা চলাকালে সহযোগিতা করা দেশের জনগণ, তার টিম এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসের প্রশংসা করে বলেন, তিনি একটি গঠনমূলক ও দৃষ্টান্তমূলক প্রচারণা পরিচালনা করেছেন, যা ভবিষ্যতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বক্তব্যে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ তার নবম দশকে প্রবেশ করতে যাচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন সংস্থাটির প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বিভিন্ন দিক থেকে পরীক্ষার মুখোমুখি। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে, উন্নয়ন অর্জনগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও পশ্চাদপসরণ দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং জাতিসংঘের আর্থিক সংকট সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
শান্তি ও নিরাপত্তা খাতে নিজের অগ্রাধিকার তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অভিজ্ঞতা ও অবদান থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নেবেন। সাইপ্রাস থেকে সুদান পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তি প্রতিষ্ঠা জোরদার এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে তিনি কাজ করবেন। একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের বিষয়ে খলিলুর রহামান বলেন, ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি ও অর্জনের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ২০২৭ সালের এসডিজি সম্মেলনকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা লক্ষ্যগুলো অর্জনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ছাড়া এসডিজি অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ, ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এবং নারী ও কন্যাশিশুদের পূর্ণ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন ইউএনজিএর নবনির্বাচিত সভাপতি।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গৃহীত দোহা কর্মসূচিসহ উন্নয়ন-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তিনি বিশেষ নজর দেবেন।
অভিনন্দন
এরআগে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
এ জয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতয়ি সংসদের স্পিকার মেজর(অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চীন, ভারত ও পাকিস্তানও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দুই প্রার্থীকে ভোট দেন। নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ১৯০টি। খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট আর আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এই অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ওই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা ও ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে বলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো বসছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি। ৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। রাজনীতিতে যোগদানের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।
সাবেক পেশাদার কূটনীতিক খলিলুর রহমান কর্মজীবনের বড় অংশজুড়ে জেনেভা ও নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান। এরপর ২৫ বছর নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি; ছিলেন জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রকাশনার প্রধান লেখক।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ বা আরএসএর (একে অপরকে ভোট প্রদানের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি) মাধ্যমে এবার ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। এই পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি আদায়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকায় মাত্র তিন মাসের প্রচারের পরও বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করে। তবে এই পদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। এর পর থেকে পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচার শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত প্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে। অপর দিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে। এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচার চালায় দেশটি।
এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন
এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।
এ অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, তিনি (খলিলুর রহমান) গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বহুপাক্ষিক ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।’
ঢাকায় চীনের দূতাবাস রাতে এক ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানায়। ওই পোস্টে অভিন্ন অগ্রাধিকার ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে খলিলুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চীনের আগ্রহের কথা তুলে ধরা হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।