❒ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি
ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: প্রতীকী
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার চরম শঙ্কার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আগামী তিন মাসের জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি কোনো কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এপ্রিল মাস থেকে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ফার্নেস অয়েলের যে মজুত বর্তমানে রয়েছে, তা দিয়ে বড়জোর মার্চ মাস এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চালানো সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন থেকেই এপ্রিলের ফার্নেস অয়েল সরবরাহ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। একই সাথে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়েও বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই সামগ্রিক সংকটের মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, স্থানীয় বাজারে তেলের দাম এখনই বাড়ানো হবে না।
সম্প্রতি ইরানে হামলা এবং দেশটির প্রধান খামেনিকে হত্যার জেরে ইরান গত তিন দিনে কুয়েতে দফায় দফায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। আগামী মার্চ মাসে কুয়েত থেকে দুটি এলএনজি কার্গো আসার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেগুলোর নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক সোমবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ১৫ মার্চের পর কুয়েত থেকে দুটি এলএনজি আসার শিডিউল রয়েছে এবং সেগুলো নিশ্চিত করতে ইতিবাচক পত্র পাঠানো হয়েছে। তবে সেই পত্রের কোনো জবাব এখনো মেলেনি। সাধারণত কুয়েত অনেক সময় বিকল্প হিসেবে অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া বা অস্ট্রেলিয়া থেকেও এলএনজি সরবরাহ করে থাকে; এবারও যদি তারা সেই পথ অনুসরণ করে তবে বাংলাদেশের জন্য সেটি স্বস্তির কারণ হবে। অন্যথায়, চড়া দামে খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে এই গ্যাস কিনতে হবে।
জ্বালানি খাতের এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, মে মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি বিভাগ এখন দফায় দফায় বৈঠক করছে যাতে আগামী তিন মাসের জন্য এলএনজি এবং তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো মূল্যে সচল রাখা যায়। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে বছরে ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয় যার মধ্যে ৪০ লাখ টনই আসে কুয়েত থেকে। প্রতি মাসে কুয়েত থেকে গড়ে ২-৩টি কার্গো আসে, যা বন্ধ হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ধস নামবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত ১৫-১৬টি তেলের জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। আশার কথা হলো, এর বেশির ভাগই পরিশোধিত তেল যা চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো বন্দর থেকে আসবে এবং এগুলোর রুট হরমুজ প্রণালির বাইরে। তবে সৌদি আরব থেকে আসা দুটি অপরিশোধিত তেলের জাহাজ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে, কারণ সেগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার কথা। বিপিসি বর্তমানে সেই জাহাজগুলো বিকল্প কোনো বন্দর দিয়ে আনা যায় কি না, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি তেলের চাহিদার মধ্যে ১৩ লাখ টনই অপরিশোধিত তেল, যা মূলত ওই ঝুঁকিপূর্ণ রুট দিয়েই আসে। ফলে ইরান যদি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বাজারে উত্তেজনার কারণে সোমবার তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে এবং এটি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও সরকার গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসের জন্য তেলের দাম ঘোষণা করেছে এবং আপাতত এই মাসে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে একনাগাড়ে বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকলে এপ্রিল মাসে তেলের দাম নতুন করে সমন্বয় করা হতে পারে। এদিকে বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সভায় ফার্নেস অয়েল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। মার্চ মাসের জন্য ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৯ টন তেলের মজুত থাকলেও নতুন করে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে এপ্রিল মাসে দেশজুড়ে মারাত্মক লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।