আল জাজিরা
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছবি: আল-জাজিরা
যে দলটি একসময় লৌহমুষ্টিতে বাংলাদেশ শাসন করেছিল, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালট পেপারে তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকছে না। দলটির সমর্থক—এবং খোদ দলটির ভবিষ্যৎ—এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের মুখে।
বাংলাদেশর বিশাল পদ্মা নদীতে রাতভর মাছ ধরার পর ভোরের দিকে পা ধুয়ে নিচ্ছিলেন মাঝি রিপন মৃধা। তার চোখ তখন স্থানীয় বাজারের দোকানের দেয়াল আর শাটারগুলোর ওপর দিয়ে ঘুরছিল। কিছুদিন আগেও কেন্দ্রীয় বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার এই এলাকাটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ পার্টির স্থানীয় নেতাদের বিশাল সব পোস্টার আর ব্যানারে প্লাস্টার করা ছিল।
আজ সেই চিহ্নগুলো সব উধাও। একটি দলের খুব সামান্য চিহ্নই অবশিষ্ট আছে সেখানে, যারা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার লৌহমানবীর মতো শাসনের পতন এবং তাকে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার আগে টানা ১৫ বছর দেশ শাসন করেছে।
অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০১০ সালে হাসিনার নিজেরই প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল—যা বিরোধীদের দমনের জন্য তিনি ব্যবহার করতেন—আজ পরিহাসের ছলে তাকেই তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আন্দোলনের সময় ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষের হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকার জন্য এই সাজা দেওয়া হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটিতে হাসিনার পতনের পর প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজীবন আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া মৃধা এখন এই নির্বাচন নিয়ে কোনো উৎসাহ বোধ করছেন না। তিনি এক দ্বিধায় পড়েছেন, কারণ ব্যালটে আওয়ামী লীগের 'নৌকা' প্রতীক থাকবে না।
প্রায় ৫০ বছর বয়সী এই মাঝি বলেন, তার পরিবার এখন ভয়ে আছে যে তারা যদি ভোট দিতে না যায়, তবে তাদের আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। এমন এক সময়ে এই ভয় কাজ করছে যখন হাসিনা এবং তার দলের ওপর সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে—যুগ যুগ ধরে চলা হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমনের কারণে।
হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি—আওয়ামী লীগের এই দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—পদ্ধতিগতভাবে নির্যাতিত হয়েছিল। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাদের নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং অনেককে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ছিলেন, যিনি গত ডিসেম্বরে মারা যান। তার ছেলে এবং বর্তমান বিএনপি নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরেছেন।
নির্বাচনের প্রস্তুতি চললেও দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য দলের নেতারা নিহত হয়েছেন। কিন্তু এখন অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরাও আর নিরাপদ নন। নেতাদের কর্মকাণ্ডের কারণে যে গণক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা থেকে তারা রেহাই পাচ্ছেন না। মৃধা আল জাজিরাকে বলেন, ‘যদি আমরা ভোট দিতে না যাই, তবে আমাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি থাকে। তাই আমার পরিবার ভোটকেন্দ্রে যাবে।’
‘আওয়ামী লীগ আগেও সংকটে পড়েছে, কিন্তু এভাবে পুরোপুরি
অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কখনো হয়নি।’
আওয়ামী লীগের একসময়ের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে দীর্ঘদিনের ভোটারদের সাথে কথা বলে এক বিভক্ত মনোভাব ফুটে উঠেছে। অনেকে বলছেন তারা কেন্দ্রে যাবেন, আবার অনেকে বলছেন তারা ভোটই দেবেন না।
যেমন ঢাকার দক্ষিণে গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়া। এই জেলাটি হাসিনা পরিবারের দুর্গ এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান। সেখানে তার কবর আজও এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রভাবের প্রতীক হয়ে আছে। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে হাসিনা এখান থেকে বিশাল জয় পেয়েছেন। কিন্তু সোলায়মান মিয়া স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি বা তার পরিবার এবার ভোট দেবেন না। তিনি বলেন, ‘ব্যালটে নৌকা নেই মানে সেটা কোনো নির্বাচনই না।’ গোপালগঞ্জের অনেক বাসিন্দাই এই একই সুর প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয় এখন পরিত্যক্ত। অভ্যুত্থানের সময় এটি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। বর্তমানে ভবনটি গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল এবং এর কিছু অংশ পাবলিক টয়লেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাস্তার বিক্রেতা আব্দুল হামিদ বলেন, গত কয়েক মাস ধরে তিনি এই এলাকায় আওয়ামী লীগের কোনো কর্মী দেখেননি। এখানে কোনো আওয়ামী লীগ সমর্থক খুঁজে পাবেন না। কেউ সমর্থক হলেও তা স্বীকার করবে না। আওয়ামী লীগ আগেও সংকটে পড়েছে, কিন্তু এভাবে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কখনো হয়নি।
কাছেই আরেক বিক্রেতা সাগর এখন বিএনপি এবং তাদের সাবেক মিত্র (বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী) জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক সংবলিত উলের স্কার্ফ বিক্রি করছেন। তিনি জানান, এই দলগুলোর স্কার্ফ এখন ভালোই বিক্রি হচ্ছে।
কিছু সমর্থক এখনো দলের ফিরে আসা নিয়ে আশাবাদী। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরমান মনে করেন, দলটি এখন কৌশলগতভাবে নীরব রয়েছে, কিন্তু তাদের শেকড় অনেক গভীর। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ফিরবে এবং যখন ফিরবে, তখন শেখ হাসিনাকে নিয়েই ফিরবে।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি এতটুকু নিশ্চিত নন। তিনি মনে করেন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে টিকে থাকা আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন হবে। তার মতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে তাদের ভোটাররা ধীরে ধীরে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী শক্তির সাথে মানিয়ে নেবে এবং নিজেদের দৈনন্দিন জীবন পুনর্গঠন করবে। ফলে নির্বাচন শেষ হলে আওয়ামী লীগের পক্ষে তাদের জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি আরও যোগ করেন যে, সমর্থকদের একটি অংশ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনে বিরক্ত ছিল।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান শক্তিশালী অবস্থান আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের সাহস তৈরি করতে পারে। জামায়াত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, যা হাসিনা বারবার তাদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে ব্যবহার করতেন। দলটিকে দুইবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তবুও তারা টিকে আছে এবং আগামী নির্বাচনে ভালো করার অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র তার নেতৃত্ব নয়, বরং এটি দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তির সাথে যুক্ত, তাই একে পুরোপুরি মুছে ফেলা অসম্ভব।
আইআরআই-এর এক জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের এখনো প্রায় ১১ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। তবে বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের নেতারা ভারত থেকে নিজেদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন। দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে হাসিনার একটি অডিও বার্তা প্রচারিত হয়েছে। এই ঘটনায় ঢাকা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না। এটি হবে একটি 'অ্যাস্টারিস্ক' বা শর্তযুক্ত নির্বাচন। তবে তিনি এও বলেন যে, হাসিনা যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন, তাতে দলটি বৈধ দল হওয়ার অধিকার হারিয়েছে। কুগেলম্যান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বংশগত রাজনীতি সহজে মরে যায় না। আওয়ামী লীগ হয়তো এখন 'অপেক্ষা করার কৌশল' নেবে। হয়তো ভবিষ্যতে সজীব ওয়াজেদ জয়কে উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনা হবে। তবে আপাতত তারা গভীর সংকটে।
রাজবাড়ীর সেই মাঝি মৃধার জন্য এই অনিশ্চয়তা খুবই কষ্টের। তিনি তার বাবার কথা মনে করে বলেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ অনেক সংগ্রাম করেছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এবার হয়তো সব একেবারে মুছে যাচ্ছে।’