Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

প্রাচ্যবিদদের ইসলাম চর্চার আড়ালে/এক

এম কে জামান এম কে জামান
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ জুন,২০২৬, ০২:১৪ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ২৬ জুন,২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
প্রাচ্যবিদদের ইসলাম চর্চার আড়ালে/এক

সলামের সোনালি ভোর যখন আরব উপদ্বীপের দিগন্তে উদিত হয়েছিল, তখন তা কেবল একটি ধর্মের নাম ছিল না; বরং তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবের মনোজগৎ ও সভ্যতায় আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিল। জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা এবং শাসনকার্যের যে স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছিল, তা ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সেই সভ্যতার নেতৃত্ব একসময় হাতবদল হয়ে যায়। পশ্চিমা শক্তি যখন তাদের অন্ধকার যুগ পার করে নবজাগরণের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন তারা মুসলিম সভ্যতার অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডারকেই তাদের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। অথচ, এই জ্ঞান আহরণের প্রক্রিয়াটি ছিল এক রহস্যময় ও দ্বিমুখী যাত্রার শুরু।

পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ বা ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’দের ইসলাম চর্চার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল নির্মোহ জ্ঞানচর্চার প্রয়াস ছিল না। বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল সূক্ষ্ম সাম্রাজ্যবাদী ও মিশনারি দুরভিসন্ধি। আন্দালুসিয়ার মাদ্রাসায় ল্যাটিন পাদ্রিদের আরবি ভাষা ও কুরআন শিক্ষার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে এক পরিকল্পিত অভিযানে রূপ নেয়। তারা বুঝতে পেরেছিল, মুসলিম জাতিকে পরাজিত করতে হলে কেবল সামরিক শক্তিই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মূলে আঘাত করতে হবে।

এই প্রাচ্যবিদরা একদিকে যেমন ইসলামি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে ইউরোপের লাইব্রেরিতে সমৃদ্ধি এনেছে, অন্যদিকে তাদের লেখনীর মাধ্যমে ইসলামের মূলনীতি ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে শুরু করেছে। উসমানীয় খেলাফত ও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস নিয়ে তাদের অসংখ্য মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য আজ আন্তর্জাতিক গবেষণার মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান সময়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের গবেষকরা অন্ধ অনুকরণ ও অতিভক্তির কারণে তাদের এই সাম্রাজ্যবাদী ও মিশনারি মতাদর্শকে পরম সত্য বলে গ্রহণ করছে। ইসলামের সোনালি ইতিহাসকে ধূলিধূসরিত করার যে অপচেষ্টা প্রাচ্যবিদরা কয়েক শতাব্দী ধরে চালিয়ে আসছে, তার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করা আজকের যুগের এক অনিবার্য দাবি। আমাদের হারানো আত্মপরিচয় ফিরে পেতে হলে প্রাচ্যবিদদের এই ‘বিষাক্ত মায়াজাল’ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

যদি আমরা পেছনে তাকাই তাহলে দেখি, যেদিন আরবের মাটিতে ইসলামের আলো এসে পড়ে সেথেকে শতধাবিভক্ত জাতিগোষ্ঠী পেয়ে যায় হেদায়েতের অবিনাশী নুর । সেই নুরে জ্বলে উঠে হাজারো মশাল আলোকিত হয় পৃথিবী নামক গ্রহ । জাহেলিয়াতের ভ্রান্ত বেড়াজালে আবদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন এক জাতি ইসলামকে আঁকড়ে ধরে গোটা পৃথিবীতে রাজ করতে শুরু করে । শতাব্দীর পর মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতিকে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যায় । কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে নির্মিত সভ্যতা অবহেলা আর অযত্নে হারিয়ে যায় পশ্চিমাদের কাছে । আগ্রাসী শক্তি ধীরে ধীরে গিলতে থাকে রক্তের সিঁড়ি বেয়ে গড়া মানবতার ইতিহাস ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্য সভ্যতা সংস্কৃতির বুকে প্রতারণা ও শঠতার তীর বিদ্ধ হয়েছে বহুবার । ইসলাম পৃথিবীবাসীকে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারাচ্ছন জীবনের পরিবর্তে যে সোনালী ভোর উপহার দিয়েছে তারা তা ধূলিধূসরিত করতে চায় ।  বড় দুঃখের বিষয় হলো তারা ইসলাম ও মুসলমানদের এমন কোন দিক নেই এমন কোনো ভূখণ্ড নেই যেখানে তাদের বিষদাঁত বসায়নি । মুসলমানদের কোমল হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে চলেছে । তাফসির, হাদিস, ফেকাহ থেকে শুরু করে শিল্প সাহিত্য ও ইতিহাস ঐতিহ্য সব বিষয়ে তারা কলম ধরেছে । তাদের লেখা বই পুস্তক গুলো আন্তর্জাতিক গবেষক ও স্কলারদের কাছে উৎসগ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত করতে সক্ষম হয়েছে । আজ একটি বড় আফসোসের বিষয় হলো, হতভাগা মুসলমানরাই তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে এতটাই গাফেল যে, সাহাবায়ে কেরাম আজমাইনের ত্যাগ ও কুরবানি  বেমালুম ভুলতে বসেছে । জীবনের সব আরাম আয়েস ত্যাগ করে দ্বীনের গোঁড়ায় যে পানি সিঞ্চন করে গেছেন তারা তা দেখেও হাত  গুটিয়ে বসে আছে । আমাদের কোমল মতি সন্তানদেরকে যে ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে তা ওরিয়েন্টালিস্টদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠা বিষাক্ত মায়াজাল । তারা কৌশলে শিশুদের নিষ্পাপ অন্তঃকরণে এমনভাবে সন্দেহের পোকা ঢুকিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে তারা তাদের সেবা দাসে পরিণত হচ্ছে । যেমন আরব জাহানের উপর উসমানীয় শাসনামলের অসংখ্য বিদঘুটে ও উদ্ভট ঘটনাবলী ইতিহাসের পাতা কালো করে রেখেছে । প্রাচ্যবিদরা এ বদ্ধমূল ধারনা প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছে যে, তুর্কি মুসলমানরা ছিলো আরব জাহানের উপর দখলদারিত্ব ।

 বড় দুঃখের বিষয় হলো তারা ইসলাম ও মুসলমানদের এমন কোন দিক নেই এমন কোনো ভূখণ্ড নেই যেখানে তাদের বিষদাঁত বসায়নি । মুসলমানদের কোমল হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে চলেছে । তাফসির, হাদিস, ফেকাহ থেকে শুরু করে শিল্প সাহিত্য ও ইতিহাস ঐতিহ্য সব বিষয়ে তারা কলম ধরেছে । তাদের লেখা বই পুস্তক গুলো আন্তর্জাতিক গবেষক ও স্কলারদের কাছে উৎসগ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত করতে সক্ষম হয়েছে ।

বর্তমান সময়ে লেখক ও গবেষকদের মধ্যে অনেকেরই প্রাচ্যবিদদের কর্মকাণ্ড শুদ্ধ-অশুদ্ধ গবেষণা ও কলম চর্চার উদ্দেশ্য বিবেচনা না করে বরং তাদের প্রতি অন্ধ শ্রধা ও অতিভক্তি করতে দেখা যায় । বড়জোড় কারো লেখায় তাদের সাম্রাজ্যবাদী ও মিশনারি দুরভিসন্ধির সংক্ষিপ্ত বিবরণ উঠে আসলেও প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায় । এ ক্ষেত্রে স্যার নজিব আকিকী, ডক্টর মুহাম্মাদ আল বাহির লেখা বিশেষ উল্লেখ্য । এছাড়া প্রাচ্যবিদের সাধনা ও অবদানের প্রশংসায় যাদের মুখে রীতিমত খৈ ফুটতে দেখা যায় যাদের তাদের মধ্যে ডক্টর ত্বহা হুসাইন অন্যতম । গোল্ড জেহের ও মার্জিলিউসের মতো কট্টর ও উগ্র প্রাচ্যবিদ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরদ্ধে যে বৈরী চিন্তা চেতনা লালন করে, ডক্টর ত্বহার “আল আদাবুল জাহিলি” সেই ভ্রষ্টাচারের সোচ্চার প্রতিধ্বনি ।

ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, পশ্চিমারা কুরআন ও আরবি ভাষা শেখার মধ্যদিয়ে তাদের এই যুদ্ধ যাত্রা শুরু করে । ঠিক কবে থেকে তারা এ কাজে মনোনিবেশ করে তার তারিখ-ক্ষণ জানা না গেলেও এ কথা বলা যায় যে, আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনের সোনালি সময়ে সেখানকার মাদ্রাসাগুলোতে পশ্চিমা পাদ্রিরা পড়াশুনা করতো । এখান থেকে তারা কুরআন সুন্নাহ, ফিলোসফি, চিকিৎসা ও গণিত বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে । এ সময়ে তাদের মাধ্যমে কুরআন সহ বিভিন্ন আরবি গ্রন্থ পশ্চিমা ভাষায় অনূদিত হয় । তাদের এ আন্দোলনের নেতা হিসাবে প্রথমে আসে ফরাসী পাদ্রী জারবার্ট (Jerbert) এর নাম। যিনি আন্দালুসের বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে স্বদেশে ফিরে গিয়ে রোমের প্রধান পোপ মনোনীত হন । এ ছাড়াও পিরেল আনার ( Pierrele Aenere) ও জেরাড ডি গ্রেমোনি ( Gerard de Gremone) পাদ্রীদের নাম উল্লেখযোগ্য। এ সমস্ত পাদ্রীরা স্বদেশে ফিরে আরবদের শিক্ষা সংস্কৃতি ও সভ্যতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়। এমনকি তারা আরবি জ্ঞান বিস্তারে অসংখ্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে । সেখানে আরবি থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত বই-পুস্তক পড়ানো হতো । গোটা ইউরোপে তখন ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত এ সমস্ত রচনাবলী জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার উৎসগ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হতো । প্রায় ছয়শ বছর আরব স্কলারদের রচনাবলী পশ্চিমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোর মশাল জ্বালিয়েছে । এভাবেই প্রাচ্যে এক দল জ্ঞানপিপাসু তৈরি হয়েছিল যারা আরবি ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হয় । অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই পাদ্রী পণ্ডিত মশাইরা ইসলামের সকল বিষয়ে জ্ঞান আহরণে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে  ।

উনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিম কর্তৃক মুসলিম জাহানের উপর সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নতুন এপিসোড শুরু হয় । এতদিন তারা যাদের কাছ থেকে জ্ঞান দর্শন শিখেছে এখন তাদের উপরই শাসনের রক্তচক্ষ দেখাতে শুরু করে । একের পর এক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে । ইসতিশরাকের ময়দানকে ঋদ্ধ করতে তারা মুসলিম জাহান থেকে মূল্যবান পান্ডলিপি সংগ্রহ করে । কমছে কম ২ লক্ষ ৫০ হাজার পান্ডলিপি আরবদের হাতছাড়া হয়ে চলে যায় ইউরোপের লাইব্রেরিতে । এরপর মুসতাশরিকরা প্রচার প্রচারণার এজেন্ডা হাতে নেয় । ১৮৭৩ সালে প্যারিসে মুসতাশরিকদের প্রথম কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় । সেখানে তারা প্রাচ্যের বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান, ধর্ম, সভ্যতা সংস্কৃতির উপর নিজেদের অভিমত উপস্থাপন করে । এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ চিত্র তা হলোঃ  

প্রথমত, খ্রিস্টান পাদ্রীদের এই কসরতের প্রধান লক্ষ্য ছিলো ইসলামের সুমহান আদর্শের উপর অভিযোগের স্তূপ সাজিয়ে তার সৌন্দর্যে কালিমা লেপন করে ইসলামের মূলনীতি ও বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা । ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই অব্যাহত বিজয়প্রবাহ, এরপর ক্রসেড যুদ্ধ ও সবশেষে ইউরোপের বুকে উসমানীয় খেলাফাতের একের পর এক বিজয় তাদের মনে ইসলামী শক্তি সম্পর্কে ভীষণ ভয় ও বিরক্তির  জন্ম দিয়েছিল ।

দ্বিতীয়ত, তাদের মিশনারি মনোবৃত্তি। তারা প্রত্যেকে নিজ ধর্মের এক একজন নিবেদিত প্রাণ আম্বাসেডর । তাইতো নিজেদেরকে সফল ধর্ম প্রচারক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামকেই টার্গেট করে । ইসলামী ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করে।

তৃতীয়ত, ক্রসেডের শোচনীয় পরাজয় সত্ত্বেও তারা এক মুহূর্তের জন্যেও তাদের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা থেকে সরে আসেনি । যুদ্ধের কৌশল পাল্টে এবার ঢাল তলোয়ার রেখে আরব তথা গোটা মুসলিম জাহান নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করে । মুসলমানদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সম্পদসহ প্রতিটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে নেমে পড়ে । তারা সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পর আধ্যাত্মিক ও মনোজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আঘাত করে । আমাদের চিন্তাধারায় সন্দেহ ও সংশয়ের ঘুণে পোকা ধরিয়ে দেয় । আমাদের বিশ্বাস ভাঙতে শুরু করে । তাদের প্রবিষ্ট ধারালো ফলায় আমাদের উত্তরাধিকারের দেয়ালে চিড় ধরে যায়। যার ফলে আমরা আমাদের অমূল্য আত্মবিশ্বাস হারিয়ে নিঃস্ব পথিকের মতো হাত বাড়াতে শুরু করি । তারা চেয়েছিল আমরা যেন তাদের থেকে নতুন করে বিশ্বাসের বুনিয়াদ আর নৈতিকতার মাফকাঠি শিখে নেই । তাদের বানানো কৃষ্টি কালচারের প্রতি অনুগত হয়ে পড়ি ।

আমরা খোলা চোখে তাকালে পরিষ্কার দেখতে পাবো আরবরা যেন কোনো দিন এক হতে না পারে সে জন্য পশ্চিমারা প্রাণপণে খেটে যাচ্ছে । বিভেদ সৃষ্টির জন্য তারা ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনার তিলকে তাল বানিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করে । প্রাচ্যবিদরা তাদের মাথার সবটুকু ঘিলু ব্যবহার করে এমন এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে চলেছে যা আরবদের মাঝে বিভেদ আর অনৈক্যের কাঁটা তারের বেড়া টেনে দিচ্ছে। মধ্য প্রাচ্যসহ গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায়াশ উত্তপ্ত থাকে ।

চতুর্থত, ওরিয়েন্টালিস্টরা বা প্রাচ্যবিদরা বাণিজ্যিক স্বার্থ সিদ্ধির পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগে। উন্নয়ন সহায়তা ও কল্যাণকামিতার নামে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল গভীর নলকূপ ইত্যাদি জনহিতকর কাজ করে। অতীতের ধারাবাহিকতায় এখনো বেশ কিছু আরব ও মুসলিম দেশে তাদের এ মিশন অব্যহত রয়েছে । এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা আদতে মসলমানদের  মনে জায়গা করে নেয় । পরে  তাদের একটিকে অন্যটির বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ফলে পরস্পরে অনৈক্য ও বৈরীতার জালে জড়িয়ে যায়।

পঞ্চমত, প্রাচ্যবিদদের এক দল তাদের ধর্মীয় গোঁড়ামি মানসিক বৈরিতার কারণে নবী কারীম (স.) এর নবুয়াতকে অস্বীকার করে । অথচ এই গবেষকদের অধিকাংশই ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান । তারা তাওরাতে আলোচিত নবী রাসুলদের কথা স্বীকার করে । যদি কেউ নবী মুহাম্মাদ (স.) কে অস্বীকার করে তবে কিভাবে সে কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসাবে মেনে নিবে ? সেই ধারাবাহিকতায় তারা ইসলামকে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম হিসাবে স্বীকার না করে ইয়াহুদিইজম ও খ্রিস্টীয় ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত মানব রচিত মতবাদ হিসাবে বিবেচনা করে । যদিও এর পিছনে নির্ভরযোগ্য কোন জ্ঞানজ প্রমাণ তাদের হাতে নেই । পশ্চিমা সমাজের কোনো পাদ্রী, ধর্ম ব্যবসায়ী ও মিশনারি নিজেকে এই ধারনা থেকে মুক্ত রাখতে পারেনি । তারা নবী মুহাম্মাদ (স.) এর নবুয়াতকে যেমন স্বীকার করে না তেমনি কুরআনকে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত আসমানি কিতাব হিসাবে অস্বীকার করে ।

তাদের সামনে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, কুরআন যদি আসমানি গ্রন্থ না হয় তবে কিভাবে তার মাঝে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর খুটি নাটি বিবরণ উঠে এসেছে কীভাবে? নবী মুহাম্মাদ (স.) এর মতো একজন অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যক্তির পক্ষে সহস্র বছর আগের এমন তথ্য উপস্থাপন করা কি সম্ভব ? এমন অকাট্য যুক্তির জবাবে প্রাচ্যবিদরা নবী যুগের আরবের মুসরিকদের মতো উত্তর দিতো । সবশেষে তারা বলত ব্যক্তি মুহাম্মাদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও দূরদর্শী তাই কুরআন এত তথ্য নির্ভর ।

তারপর প্রাচ্যরা হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে । ইসলামি ফিকহির নিজস্ব মূল্যমান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ
করে। মুসলামমানদের শরীয় আইন ও সংবিধানের যে বিপুল প্রাচুর্য রয়েছে তা দেখে মুসতাশরিক সমাজ আক্ষরিক অর্থেই হতবাক। তখন তারা নতুন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বলে সুবিশাল ফিকহির জ্ঞানভাণ্ডার রোমানদের সামাজিক সংবিধান থেকে আহরিত । প্রাচ্যদের এ সমস্ত অবান্তর ধারনার মুখে চুনকালি মেখে দিয়েছে লাহাই তে অনুষ্ঠিত “সমকালীন আইন ও সংবিধান” কনফারেঞ্চ । গবেষক ফোরাম এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ইসলামী ফিকাহ একটি স্বতন্ত্র সংবিধান এটি কোন মানব রচিত সংবিধান থেকে আহরিত হয়নি । প্রাচ্যবিদরা প্রকৃত পক্ষে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দুরভিনন্ধি থেকে মুসলমানদের সার্বিক জীবন আচারনের পরিবর্তন চেয়েছিল। মুসলিমদের শিক্ষা সংস্কৃতি ও সভ্যতাগত ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিভিন্ন উদ্ভট মিথ্যা সব ধারনার জন্ম দেয়। যাতে মসলামনরা বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে না পারে। চিরকাল পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ- প্রেম যেন তাদেরকে পাশ্চাত্যের সেবাদাস বানিয়ে রাখে ।

আমরা খোলা চোখে তাকালে পরিষ্কার দেখতে পাবো আরবরা যেন কোনো দিন এক হতে না পারে সে জন্য পশ্চিমারা প্রাণপণে খেটে যাচ্ছে । বিভেদ সৃষ্টির জন্য তারা ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনার তিলকে তাল বানিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করে । প্রাচ্যবিদরা তাদের মাথার সবটুকু ঘিলু ব্যবহার করে এমন এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে চলেছে যা আরবদের মাঝে বিভেদ আর অনৈক্যের কাঁটা তারের বেড়া টেনে দিচ্ছে। মধ্য প্রাচ্যসহ গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায়াশ উত্তপ্ত থাকে ।

ওরিয়েন্টালিস্ট সমাজ তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । তার কিছু বাস্তব চিত্র সামনে আনতে চাই ।

তাদের চিন্তাধারা ও গবেষণা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সব প্রস্তুতি তারা গ্রহণ করেছে । একদিকে যেমন ইসলামী চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঘুণ ধরিয়ে মুসলিমদের মনে সংশয় তৈরি করছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মকে অধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও গবেষণার ছদ্মবেশে ইসলাম থেকে দুরে সরিয়ে নিচ্ছে । উন্নয়ন ও মানব সেবার কথা বলে খ্রিস্টান মিশনারির ব্যানারে হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র, অতিথিশালা বানাচ্ছে । তাদের মতবাদকে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা প্রকাশ করে। ১৭৮৭ সালে ফরাসীরা একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ১৮২০ সালে প্রথম “দ্যা এশিয়াটিক জার্নাল” নামে পত্রিকা বের করে । লন্ডনে ১৮২৩ সালে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে । ১৮৪২ সালে আমেরিকানরা এগিয়ে আসে। আমেরিকান ওরিয়েন্টাল সোসাইটির মাধ্যমে যে ঢেউ তৈরি উঠে তা ইউরোপ রাশিয়া অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীতে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইটালিতে তার প্রভাব পড়ে । বিশেষ করে মার্কিন ওরিয়েন্টালিস্টরা সবচেয়ে বিপদজনক ভাবে এগিয়ে আসে । ১৯১১ সালে জুইমার (Zweimer) পৃষ্টপোষকতায় আমেরিকার হার্ডফোরড থেকে কে ক্রাগ (K. Cragg)  এর সম্পাদনায়  “The Muslim World” পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ফরাসী ওরিয়েন্টালিস্টরা “আল আলামুল ইসলামী”র  আদলে “Le Monde Musalman” নামে গবেষণা পত্রিকা বের করে যা মিশনারি চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখনো তারা মুসলিম বিশ্বের কিছু পত্র পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তাদের গবেষণা কর্ম প্রচার করার জন্য পয়সা খরচা করছে । তারা আমাদের অনেক জাতীয় পত্র পত্রিকা কিনে ফেলেছে । ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র গুলোতে ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে । অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মিসরের কায়রো, সিরিয়ার দামেস্ক, ইরাকের বাগদাদ, মরক্কোর রাবাত, পাকিস্তানের করাচী ও লাহোর, ভারতের আলীগড় সহ মুসলিম ও আরবি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা পেশ করার জন্য তাদেরকে আমন্ত্রণ জানান হয় ।

ডক্টর আহমাদ ফররুখ ও মুস্তাফা আল খালেদীর গবেষণায় মুস্তারিকদের (প্রাচ্যবিদদের) প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে । প্রাচ্যবিদরা তাদের পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নে ১৭৮৩ সাল থেকে আজ অবধি নিয়মিত কনফারেন্সের আয়োজন করে যাচ্ছে । গবেষণার নামে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে বিশ্বকোষ ও সিরিজ প্রকাশ করছে ।

এমনকি ইসলামিক ইনসাইক্লোপিডিয়া (The Encyclopeadia of Islam) রচনা করেছে তারা । অনেক বড় বড় ইসলাম বিদ্বেষী ওরিয়েন্টালিস্ট কাজ করেছে এখানে । অসংখ্য বিষমিশ্রিত তথ্য, মিথ্যা ও মনগড়া কথাবার্তা সন্নিবেশিত করেছে। পৃথিবীর অনেকগুলো জীবন্ত ভাষায় বিশ্বকোষটি প্রকাশিত হয়েছে । একের পর এক নতুন সংস্করণ আলোর মুখ দেখছে। শুধু তাই নয় ধর্ম ও নৈতিকতার বিশ্বকোষ (The Encyclopeadia of Religion & Ethics) ও Encyclopeadia of Social Science) নামে বড় বড় গবেষণা কর্ম তারা আমাদেরকে উপহার দিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা সেগুলিকে পবিত্র মনে করছি। হাল জামানার অনেক মুসলিম গবেষক এই ইনসাইক্লোপিডিকে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের উৎস হিসাবে বিতর্কহীন প্রমাণ জ্ঞান মনে করে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করছেন । নিঃসন্দেহে এটি ইসলামী ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতা ও আত্মসম্মানবোধহীনতার সুস্পষ্ট উদাহরণ ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)