মো. খায়রুল আবেদীন
পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত প্রাচীন সভ্যতার আকরভূমি পারস্য। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে 'সাইরাস দ্য গ্রেট' আকেমেনীয় (অ্যাকিমেনীয়) সাম্রাজ্য গঠন করেন, যেটিকে ধরা হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য। প্রভাব-প্রতিপত্তিতে আকেমেনীয় সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন পরাশক্তি।
ইরানে প্রথম ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে কাদিসিয়া যুদ্ধের পর ইসলামের আগমন ঘটতে থাকে। পারস্যের সাথে মুসলমানদের দ্বিতীয় যুদ্ধ ছিল 'নাহাভান্দ' যুদ্ধ, যা ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়। মুসলমানরা পারস্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে এবং পারসিয়ানরা ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইরান একটি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
স্বাধীনচেতা ইরানিরা সুন্নি মতাদর্শের অধিকারী শক্তিশালী অটোমান সাম্রাজ্য থেকে নিজেদেরকে আলাদা পরিচয় দিতে শিয়ামতকে তাদের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে। সাফাভি শাসন আমলে ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে শাহ ইসমাইল শিয়ামতকে ইরানের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে শিয়া মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। সাফাভি শাসনের পর ধীরে ধীরে ইরান শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে রূপ নেয়।
১৯০০ সালের দিকে তৎকালীন কাজার রাজবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পারস্য "কসাক ব্রিগেড"-এর অফিসার রেজা খান ১৯২১ সালে ক্ষমতা দখল করেন।
তিনি ১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশকে অপসারণ করে 'রেজা শাহ পাহলভি' নামে নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৫ সালে রেজা শাহ পাহলভি তাঁর দেশের নাম 'পারস্য'-এর পরিবর্তে 'ইরান' নামকরণ করেন। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরান দখল করে এবং রেজা শাহ পাহলভিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
পশ্চিমারা রেজা শাহ পাহলভির ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ইরানের নতুন শাহ ঘোষণা করে। এভাবে ইরানে একটি পুতুল সরকার ক্ষমতা নেয়, যা ছিল ইহুদি আর খ্রিস্টানদের দীর্ঘদিনের নীলনকশার সফল বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে মূলত ইরানের তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর পশ্চিমা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে একচেটিয়া তেল উত্তোলন চলতে থাকে।
ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল ইরান। তৎকালীন ইরানি শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ইরানকে একটি সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ইসরায়েলের সাথে পুরোদমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের বিরোধিতার মুখেও ইরান ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখে।
ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের দৃশ্যপট বদলে যায় ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর। ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনী ইসরায়েলকে দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধিতা শুরু করেন। ইরান ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। এভাবে ইরান রাতারাতি ইসরায়েলের বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিণত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ যেখানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ইরান নিজেদের তেল সম্পদ নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। কিন্তু বড় বিপত্তি দাঁড়ায় ইরান যখন নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে উন্নত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। "ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে"—এমন অভিযোগ এনে পশ্চিমারা ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ নানা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকে। এক্ষেত্রে দাবার ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইসরায়েলকে। এর পিছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে রমরমা অস্ত্র ব্যবসাকে আরও চাঙ্গা করা।
দখলদার ও জায়নবাদ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সামরিক শক্তিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প দাঁড় করাতে না পারলে ভাড়াটে সৈন্য আর বিদেশী সামরিক ঘাঁটি কোনো রাষ্ট্রকে বাঁচাতে পারবে না—তা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নিজেদের অজস্র পেট্রোডলার ছড়িয়ে অন্যের থেকে নিরাপত্তা কেনার মিশন যে সম্পূর্ণ ভুল, তা আজ প্রমাণিত।
লেখক: ব্যাংকার ও ইতিহাস বিষয়ে বিদগ্ধ