এম জামান
বেশিরভাগ তেল পাম্পে আগের মতই মিলছে তেল ছবি: ধ্রুব নিউজ
কয়েকদিন আগেও জ্বালানি তেল জনজীবনে চরম ভোগান্তি তৈরি করেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ক্ষোভে ফুঁসছিল সাধারণ মানুষ; অনেক পাম্পে তেল না থাকায় সৃষ্টি হয়েছিল অচলাবস্থা। তবে তেলের দাম বৃদ্ধি ও তেল বেচাকেনায় কড়াকড়ি তুলে নেওয়ার পর সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে যশোরের অধিকাংশ তেল পাম্পে নেই যানবাহনের সেই দীর্ঘ লাইন, নেই আগের মতো হাহাকার।
শুক্রবার সরেজমিনে যশোরের বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো উপচে পড়া ভিড় আর নেই। অনেক পাম্পেই এখন ফাঁকা পরিবেশ বিরাজ করছে। তেল নিতে আসা ক্রেতারা জানান, এখন আর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না—পাম্পে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে-বৃষ্টিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলেছে।
পাম্পে তেল নিতে আসা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের ভাষ্য, “দাম বাড়লেও অন্তত তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেটাই এখন বড় স্বস্তি। আগে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যেত না।” তবে তাদের অভিযোগ, সরকার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি দাম বাড়িয়েছে। অনেকের মতে, ৫ থেকে ১০ টাকা বৃদ্ধি করলেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত, এত বেশি দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জন্য অমানবিক।
এদিকে, তেল সংগ্রহে এখন আর পুলিশ বা প্রশাসনের সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। পাম্প মালিকদের মতে, এখনও পুরোপুরি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে দাম বাড়ার পর পাম্পে অতিরিক্ত চাপ কমেছে। তারা জানান, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর মোটরসাইকেলের ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে একাধিকবার তেল নিতেন বা মজুত করতেন, এখন সেই প্রবণতা নেই। বর্তমানে অধিকাংশ মোটরসাইকেল চালকই ১০০ থেকে ২০০ টাকার তেল নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত উৎপাদন ও পরিবহন খাত। কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “তেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে উৎপাদন খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে। পরিবহন ও সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিপণ্যের দামে বড় প্রভাব পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের মতো প্রান্তিক কৃষকের ওপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, “তেলের সঙ্গে সবকিছু জড়িত। তেলের দাম বাড়লেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে। আমরা লাইনের কষ্ট থেকে মুক্তি পেলেও এখন বাজারের চাপে দিশেহারা। তেলের লাইন ছোট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের পকেটও ছোট হয়ে আসছে।”
ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কারচালক মিজানুর রহমান তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান, “আমি ভাড়া গাড়ি চালাই। তেলের দাম বাড়ার পর যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাইলে তারা রাজি হয় না, উল্টো তর্ক করে। অনেক সময় ন্যায্য ভাড়া না পেয়ে খালি হাতেই বাসায় ফিরতে হয়। এই দুর্মূল্যের বাজারে পরিবার চালানো এখন খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।”
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যশোরে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘ লাইন উধাও হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে জনমনে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে।