মুনীর মুসান্না
"যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে,
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কি জানি কি মহালগনে"
ঘুরতে বেরুলে কতকিছুর সাথে না দেখা হয়। কখনও অমাবস্যা, কখনও পূর্ণিমার দেখা মেলে। কখনও রোমান্টিকতায় বহুদিন বাদে পরিচিতজনের সাথে দেখা হয় পথে। নতুন জায়গা দেখা মানেই যেন গল্পের বইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়া—কল্পনা আর বাস্তব একসাথে মিশে যায়। ছোটবেলা থেকেই আমার খুব ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে দেখার।
একদিন হঠাৎ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঠিক হলো—চলো, আমরা দেশের একেবারে উত্তরের শেষ প্রান্ত বাংলাবান্ধা ঘুরে আসি! নামটা শুনলেই কেমন একটা রহস্যময় অনুভূতি হয়।
বাংলাবান্ধা হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের স্থান। বাংলাদেশের মানচিত্রে সহজেই বুঝতে পারা যায় ভৌগোলিক দিক থেকে এই স্থানটির নাম কতভাবে উচ্চারিত হয়। কখনও শ্লোগানে রাজপথে, কখনও আলোচনার টেবিলে টেকনাফের সাথে সমভাবে মানুষের মুখে মুখে ফেরে বাংলাবান্ধার নাম, তেতুলিয়ার নাম। বাংলাদেশের সর্ব উত্তর ও সর্ব দক্ষিণের দুটি স্থান তাই অন্যান্য স্থানের তুলনায় মুখে মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম। সেজন্য তেতুলিয়ার বাংলাবান্ধা ঘুরতে যাবার কথা এলে সকলের আগ্রহের তালিকায় উপরে থাকে। আমার ক্ষেত্রে ও তেমনটি হয়েছে।
সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। কেউ ব্যাগ গোছাচ্ছে, কেউ নতুন জামা কিনছে, কেউ আবার ভাবছে—আর কী কী নেওয়া দরকার! অবশেষে ঠিক হলো, বৃহস্পতিবার রাতেই আমরা যাত্রা শুরু করব।
মজার ভ্রমণ শুরু-
রাত ঠিক দশটায় আমরা যশোর থেকে বাসে উঠলাম। বাস ছাড়তেই শুরু হলো হৈচৈ আর হাসাহাসি। কেউ কৌতুক বলছে, কেউ গান ধরছে, কেউ আবার অভিনয় করে সবাইকে হাসাচ্ছে।
এক সময় সবাই এত হাসতে লাগলাম যে পেট ব্যথা হয়ে গেল! ধীরে ধীরে রাত বাড়ল, আর ক্লান্তিতে একে একে সবার চোখে ঘুম নেমে এলো। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চললো মাগুরা, কুষ্টিয়া এরপর লালন শাহ সেতু পার হয়ে উত্তর বঙ্গের পথে।
নতুন সকাল, নতুন দৃশ্য-
ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি বাস ছুটছে সবুজের মাঝে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি চারদিকে চা-বাগান!
আমরা তো এতদিন ভেবেছিলাম চা-বাগান শুধু পাহাড়েই হয়। কিন্তু পঞ্চগড়ে এসে দেখি সমতল জমিতেও কত সুন্দর চা চাষ হচ্ছে! সারি সারি সবুজ গাছ দেখে মনটা ভরে গেল।

একটি কুঁড়ি দুটি পাতার সমাহার নিয়ে চলেছে ইঞ্জিন গাড়ি
কাজী টি এস্টেটে এক সকাল-
কিছুক্ষণ পর আমরা পৌঁছে গেলাম কাজী টি এস্টেটে। জায়গাটা যেন ছবির মতো সুন্দর!
সেখানে ঢুকে মনে হলো, আমরা যেন প্রকৃতির এক শান্ত রাজ্যে চলে এসেছি। চারদিকে সবুজ, সুন্দর চা বাগান আর ঠান্ডা বাতাস। আমরা অনেক ছবি তুললাম, চা খেলাম, আর সকালের নাস্তা করে বেশ সতেজ হয়ে উঠলাম।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট-
দুপুরের পর আমরা রওনা হলাম বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের দিকে। পথের দুপাশে পাথর ও বালুর স্তূপ আর দূরে ভারতের কাঁটাতার দেখে মনে হচ্ছিল—আমরা সত্যিই দেশের শেষ সীমায় চলে এসেছি।
সেদিন ছিল ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কুচকাওয়াজ হচ্ছিল। আমরা গ্যালারিতে বসে সেই সুন্দর অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম।
দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী একসাথে প্যারেড করছে—দৃশ্যটা সত্যিই মনে রাখার মতো!

লেখক ও অন্যরা
সীমান্তের বিস্ময়-
জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম—এখান থেকে ভারতের শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, এমনকি ভুটানের গ্যাংটক, সিকিম, আর নেপালও খুব কাছেই! ভাবতেই অবাক লাগে, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এতগুলো দেশের কাছাকাছি থাকা যায়!
নদী আর প্রকৃতির গল্প-
পরদিন আমরা আশেপাশের নদীগুলো দেখতে গেলাম—মহানন্দা, করতোয়া আরও অনেক ছোট নদী।
কিছু নদীতে পানি কমে গেছে, কোথাও আবার ছোট ছোট স্রোত বইছে। নদীর নামগুলোও খুব সুন্দর—ডাহুক, তীরনই, নাগর… শুনলেই মনে হয় যেন গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছি।
মুনীর মুসান্নার ছোটদের গল্প টুলু
ইতিহাস আর সৌন্দর্য-
আমরা ঘুরে দেখলাম ভিতরগড় দুর্গ, রকস মিউজিয়াম আর পুরোনো শাহী মসজিদ। প্রতিটি জায়গার মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস আর গল্প। তেতুলিয়ার ডিসি পার্কে দাঁড়িয়ে আমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পতাকা দণ্ডও দেখলাম। যদিও সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল না, তাই দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল না—তবুও জায়গাটার সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে গেল।
ঘরে ফেরা-
দিনের শেষে আমরা সবাই একটু চুপচাপ হয়ে গেলাম। এত সুন্দর ভ্রমণ শেষ হয়ে যাচ্ছে—এটাই হয়তো একটু মন খারাপের কারণ। সন্ধ্যায় চায়ের কাপে শেষ আড্ডা দিয়ে আমরা আবার বাড়ির পথে রওনা দিলাম।
বাস চলতে লাগল, আর আমি ভাবছিলাম—বাংলাদেশ কত সুন্দর! এর প্রতিটি কোণ যেন এক একটি গল্প, এক একটি স্বপ্নের ছবি। এই ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে—দূরের কোনো দেশের চেয়ে, নিজের দেশেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য সৌন্দর্য আর বিস্ময়। তাই সুযোগ পেলে তোমরাও ঘুরে দেখো আমাদের এই সোনার বাংলা—হয়তো তুমিও খুঁজে পাবে তোমার নিজের গল্প।