সৈয়দ আহসান কবীর
সৈয়দ আহসান কবীর শূন্য দশকের বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিভাবান কবি, কথাসাহিত্যিক ও নির্ভীক সাংবাদিক। ১৯৮৪ সালের ২ মার্চ যশোর জেলায় জন্মগ্রহণকারী এই লেখকের পিতা সৈয়দ আমানত আলী এবং মাতা মিসেস মনোয়ারা বেগম। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি (NTV)-র অনলাইন বিভাগে সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। স্কুলজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চায় লিপ্ত এই লেখকের কবিতায় সমাজ-চেতনা, তীব্র দ্রোহ ও প্রেমের নান্দনিক প্রকাশের কারণে তাকে 'শব্দবারুদের কবি' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার প্রকাশিত জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে 'হৃদয়ের সিন্কহোল' ও 'অথচ পাখিরা ডানা মেলে দেয়' এবং গল্পগ্রন্থগুলোর মধ্যে 'গল্পরা কথা বলে' ও 'আগুনঝরা জল' পাঠক ও সমালোচক মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত।
ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং মানব মনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ফুটিয়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘রৌদ্রছায়া সাহিত্য সম্মাননা-২০২৩’ লাভ করেন। সাংবাদিকতার শত ব্যস্ততার মাঝেও এই শব্দসৈনিক তার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। শব্দের সঙ্গে কবির প্রেম ও কবিতার কাছে মানুষের দায়বদ্ধতাই তার লেখার মূল প্রেরণা, যা তাকে যুগ যুগ ধরে পাঠকদের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।
লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে এই লেখকের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক -ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রশ্ন: ‘খড়ের গম্বুজ’ শব্দবন্ধটি শুনলে আপনার মনে প্রথম কীসের ছবি বা স্মৃতির উদ্রেক হয়? সৈয়দ আহসান কবীর
সৈয়দ আহসান কবীর: ‘একগাদা বিচালি বিছিয়ে দিতে দিতে/কে যেনো ডাকলো তাকে; সস্নেহে বললো, বসে যাও,/লজ্জার কি আছে বাপু, তুমি তো গাঁয়েরই ছেলে বটে,/আমাদেরই লোক তুমি।’ ‘খড়ের গম্বুজ’ শব্দবন্ধটি শুনলে বাংলা কবিতার জমিনজুড়ে অঙ্কিত নাম কবি আল মাহমুদের এই আহ্বানই যেন আমি শুনতে পাই। আমার মনে হয়, ধ্রুব নিউজ তার সাহিত্যের উঠোনে বিভাগীয় সম্পাদক কবি মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ডেকে বলছেন, তুমি তো যশোরেরই ছেলে, আমাদেরই লোক তুমি। একদিন যে কথা আমি তাকেই বহুবার বলে এসেছি। সে কথা যখন তার কাছ থেকে শুনতে পাই, আমি মুগ্ধ হই, স্মৃতিবদ্ধ হই। যশোরের যে কাজ আমার অসম্পন্ন থেকে গেছে, তা আমার জন্মজেলার কাদা-মাটির দেয়ালে প্রতিষ্ঠিত হবে, বর্ষার শরীরে সুগন্ধি ছড়াবে, মলিন হতে চলা যশোর সাহিত্যকে জাগিয়ে রাখবে বলে উজ্জীবিত করে।
প্রশ্ন: এই তীব্র যান্ত্রিক ও নাগরিক সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড় বা মাটির কাছাকাছি থাকাটা একজন লেখকের জন্য কতটা জরুরি?
সৈয়দ আহসান কবীর: শিকড় ছাড়া তো সাহিত্য প্রাণহীন, যেন একটি প্যালেসের সামনে নির্মাণ করা মূর্তি। লেখকের ভাষা, অনুভূতি ও সত্যিকারের জীবনবোধ আসে তার মাটি ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ থেকে। তবে, লেখার প্রেক্ষাপট তাকে কখনো কখনো মাটির কাছ থেকে মহাকাশেও নিয়ে যাবে—এটাই সত্য।
প্রশ্ন: আপনার লেখায় গ্রামীণ জীবন, লোকজ উপাদান কীভাবে জায়গা করে নেয়? কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে কি?
সৈয়দ আহসান কবীর: আমার বেড়ে ওঠা শহুরে পরিবেশে, বসবাস কলকব্জার মহানগরে। ঘোরাফেরা তাই বেশি হয় গ্রামীণ পরিমণ্ডলে। আমি সেখানকার জীবন, মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করি। আমার লেখায় ফুল, পাখি, নদী, সাগরকে শহরে বুনতে চেষ্টা করেছি। তবে, তা যে সব সময়, তা কিন্তু নয়। গ্রামীণ রূপ সেজেছে তার আসনকে দখলে নিতেই। ‘পুলিশ মানুষ’ নামে আমার একটি গল্প আছে, তা বাস্তব ঘটনার প্রতিফলন। তবে প্রকাশভঙ্গিতে স্থান আলাদা হয়েছে। শহর ও প্রবাসের দুই বন্ধুর কথাকে আমি পারিবারিক কথপোকথনে বালুবেলায় নিয়ে গিয়েছি। তবে, এ বিষয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই।
প্রশ্ন: আমরা কি ক্রমশ আমাদের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক রূপগুলো হারিয়ে ফেলছি? সেই অভাব কীভাবে পূরণ করা যেতে পারে?
সৈয়দ আহসান কবীর: সাহিত্যিক রূপগুলো তো বদলায়। ‘ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক রূপগুলো’ বলতে গেলে অনেক বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে। বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক শব্দ বেড়ে যাবে। ছোট করে বললে, কিছুটা তো হারাচ্ছিই বটে, তবে পুরোপুরি নয়। এতটুকু বলবো, লোকসাহিত্য, আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির পুনর্চর্চা দরকার। ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতো আর কতোটা নির্মাণ হলো, বলুন তো? ‘লালসালু’ পড়েননি এমন সাহিত্যপ্রেমী মেলা ভার। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর পর এভাবে আর কে ভাবলো? আমি মনে করি, সৃজনশীল পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এই অভাব পূরণ করা সম্ভব। যদিও বলতে দ্বিধা নেই, পাঠকের রূচি বদলেছে, একইসঙ্গে প্রকাশকেরও। এসব কথা চিন্তা করে অধিকাংশ কথাসাহিত্যিকরা আর গবেষণা ও প্রাণস্পর্শী লেখায় মন দিচ্ছেন না। ফলে সেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই ফিরে যেতে হয় আমাদের। তবে, কবিতার কথা কিন্তু পুরোটা ভিন্ন। সেখানে কবিকে কবি হতে হবে। আর একটি কথা, পাঠচক্র খুব দরকার—লেখকের ও পাঠকের সমন্বিত পাঠচক্র।
প্রশ্ন: এমন কোনো বই বা সাহিত্যকর্মের কথা বলবেন, যা পড়ার পর আপনার মনে হয়েছে—এটি সরাসরি মাটির গন্ধ থেকে তৈরি?
সৈয়দ আহসান কবীর: আল মাহমুদের কবিতা তো মাটির গন্ধে উৎপত্তি। তিনি বাংলার প্রকৃতি ও জীবনের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। ‘নোলক’ কবিতাটিই ধরুন না—‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।/নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তুমার কাছে?/-হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।/বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে/শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে।’ এই কবিতার পুরো শরীরজুরে তো মাটির গন্ধ। এ ছাড়া চলুন পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মানুষের কেউ কেউ’-এর কাছে। কী দারুণ লিখলেন তিনি, ‘সবাই মানুষ থাকবে না।/মানুষের কেউ কেউ ঢেউ হবে, কেউ কেউ নদী/প্রকাশ্যে যে ভাঙে ও ভাসায়।/সমুদ্র সদৃশ কেউ, ভয়ঙ্কর তথাপি সুন্দর।/কেউ কেউ সমুদ্রের গর্ভজাত উচ্ছৃঙ্খল মাছ।/কেউ নবপল্লবের শুচ্ছ, কেউ দীর্ঘবাহু গাছ।/সকলেই গাছ নয়, কেউ কেউ লতার স্বভাবে/অবলম্বনের যোগ্য অন্য কোনো বৃক্ষ খুঁজে পাবে।’ তারই লেখা ‘সোনার মেডেল’ও শহুরে কারাগারে গ্রামীণ যেন তুলনাহীন।
প্রশ্ন: আপনার লেখার আদর্শ পরিবেশ কোনটি? লেখার সময় কোনো বিশেষ অভ্যাস বা অনুঘটক কি আপনাকে সাহায্য করে?
সৈয়দ আহসান কবীর: এভাবে ভেবে দেখিনি। তবে, প্রশ্নের পর মনে করে দেখলাম, আমার লেখার অধিকাংশই প্রেক্ষাপটে রচিত। তাই প্রেক্ষাপটই আমার আদর্শ পরিবেশ। যদিও বহু কবিতা রাতেই এসেছে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলবো, একটি সিগারেট। লিখতে লিখতে কতোবার যে হাত পুড়েছে তা বলতে পারবো না। যদিও তা নতুনদের বা নবীন ও তরুণদের এটি এড়িয়ে চলতেই আমি পরামর্শ দেবো।
প্রশ্ন: আপনার কোনো জনপ্রিয় লেখার পেছনের এমন কোনো অজানা গল্প আছে, যা পাঠক বা দর্শকরা আগে কখনো শোনেনি?
সৈয়দ আহসান কবীর: অনেক লেখার পেছনে ছোট ছোট বাস্তব ঘটনা থাকে, যা সাধারণ মানুষের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও আমার লেখার ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে অন্য একদিন বলবো।
প্রশ্ন: লেখার শুরুর মুহূর্তের যে মানসিক লড়াই বা প্রথম লাইনটি লেখার দ্বিধা, তা আপনি কীভাবে পার করেন?
সৈয়দ আহসান কবীর: আমি মনে করি, কবিতা লেখা যায় না। কবিতা আসে। পুরোটা না হলেও একটি পঙক্তি অথবা অন্তত একটি শব্দ আসে। এসে হৃদয়ে জ্বলুনি তৈরি করে। নাড়িয়ে দেয়। আমি তখন নীরব হই। আগে কলম তুলে নিতাম, এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিভাইস হাতে নিই। তারপর কবিতা আমাকে লিখিয়ে নেয়। এ সময়ে আমি শব্দসাধনায় বসি। যতক্ষণ না ভাষা নিজে থেকেই আসতে শুরু করে, ততক্ষণ ভাবি। এমনও অনেক দিনই হয়েছে, আমার অফিসে কিংবা বাসায় কিংবা চায়ের দোকানে, যেখানে চা দিয়েছে, ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমাকে নাকি কয়েকবার স্মরণ করে দিয়েছে, কিন্তু আমি শুধু ‘হু’ বলেছি। আর গল্প, প্রবন্ধ বা একটি অসমাপ্ত উপন্যাসের কথা বলতে গেলে আমাকে ততোটা দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়নি। প্লট হাজির হলে লেখা শুরু করি, শেষ হয়।
প্রশ্ন: একটি লেখা শেষ হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়? আপনি কি নিজের লেখা নিয়ে সহজে সন্তুষ্ট হতে পারেন?
সৈয়দ আহসান কবীর: লেখা শেষ হলে স্বস্তি পাই।
প্রশ্ন: যদি আপনাকে আপনার নিজের যেকোনো একটি চরিত্র বা কবিতার লাইনের সাথে তুলনা করতে বলা হয়, আপনি কোনটি বেছে নেবেন এবং কেন?
সৈয়দ আহসান কবীর: খুবই কঠিন প্রশ্ন। কখনো ভেবে দেখিনি, ভবিষ্যতেও ভাবতে চাই না। এর ভার পাঠিকা-পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম। তারা যেভাবে যেখানে আমাকে রাখতে চান, আমি মেনে নেবো।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং রিলস/শর্ট ভিডিওর যুগে মানুষের পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে কি? সাহিত্যকে এর সাথে কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে?
সৈয়দ আহসান কবীর: পড়ার ধরন পরিবর্তিত হয়, হয়েছেও। সোশ্যাল মিডিয়া থাকায় আমি মনে করি লেখক ও পাঠকের মধ্যে বিশ্বজুড়ে একটি মেইলবন্ধন তৈরির সুযোগ হয়েছে। এটির সঠিক ব্যবহারে গভীর পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। রিলস কিংবা শর্টের মাধ্যমে শ্রোতা ও দর্শক তৈরি করা সম্ভব। একইসঙ্গে সারা বিশ্বের এখানে রিচ সম্ভব। তাই বইয়ের পাশাপাশি এদিকে মনোযোগী হওয়া দরকার। আমি ধারণা করি, আগামীতে প্রকাশনীগুলোর প্রকাশকদের চিন্তাচেতনাও পরিবর্তিত হবে। তারা বইকে সফটদুনিয়ায় নানা আঙ্গিকে সাজাবেন।
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর এই যুগে মানুষের আবেগের জায়গা থেকে মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখছেন?
সৈয়দ আহসান কবীর: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক সময় মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে সহযোগিতা করবে নানাভাবে। সেটি একজন পাঠক তার নিজের ইচ্ছেমতো সাহিত্য রচনা করতে বলে তা দিয়েই মনের খোড়াক মেটাবে, এটা নিশ্চিত। তবে তা সুসাহিত্য হবে বলে মনে করি না। মানবিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির বিকল্প হতে পারবে না এই এআই, তবে মৌলিক সাহিত্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। সাহিত্যে চৌর্যবৃত্তি ছিল, এখন তা যাবে এআইয়ের কাছে।
প্রশ্ন: সমকালীন তরুণ লেখকদের লেখার মধ্যে কোন শক্তি বা কোন সীমাবদ্ধতা আপনার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?
সৈয়দ আহসান কবীর: আমি নবীনদের লেখা খুব পড়ি। বার্ধক্যেও যেহেতু তারুণ্য থাকে, তাই অতদূর বলাটা আমার জন্য কঠিন। নবীনদের নিয়েই বলি। তাদের লেখায় নতুন চিন্তা আছে, সাহস আছে। এটাকে আমি তাদের লেখার শক্তি বলতে পছন্দ করবো। যদিও তাদের লেখা পড়লে আমার মনে হয়, গভীর পাঠের অভ্যাস তাদের কম এবং আছে ধৈর্যের অভাব। পাঠ বলতে তারা শুধু বই পাঠের কথা মনে করেন বলে আমার ধারণা। অথচ প্রকৃতি পাঠ, ভঙ্গি পাঠ কতোই না মধুর।
প্রশ্ন: একটি ম্যাগাজিন বা পত্রিকার ছোট পরিসরে সাহিত্যচর্চা এবং একটি আস্ত বই লেখার মধ্যে একজন লেখকের মানসিকতায় কী তফাত থাকে?
সৈয়দ আহসান কবীর: তফাত তো আছেই। ম্যাগাজিন লেখা লেখককে পরিমার্জিত করে, তাৎক্ষণিক প্রকাশের তাগিদে দেয় আর বই লেখা দীর্ঘ পরিকল্পনা, ধৈর্য ও গভীর মনোযোগের বিষয় বলে মনে করি।
প্রশ্ন: বর্তমানের সাহিত্য সমালোচনা কি তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে? একজন লেখকের মূল্যায়নে পাঠকের ভূমিকা এখন কতখানি?
সৈয়দ আহসান কবীর: বরাবরের মতোই আছে। নিরপেক্ষতা সব সময় আসলে থাকেনি, থাকেও না। তবে, তা বর্তমান সময়ের মতো ছিলো না। এখন কিছুটা উলঙ্গ তারিফ হয়। আলোচনা বা সমালোচনা বলতে যা বোঝায়, তা খুবই কম। লেখকের প্রকৃত মূল্যায়ন পাঠকের হাতেই—বলে যে কথা প্রচলিত ছিলো, তা এখন এই তারিফ-পামে মলিন হয়েছে। এতে পাঠক সঠিক বইটি হাতে পাচ্ছে না। বেশ কিছু সময় তো আমি দেখেছি, কিছু কিছু বইকে কিনতে গ্রন্থাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। বলুন, পাঠক ভালো বই হাতে না পেলে বইয়ের কাছে থাকবে কেন?
প্রশ্ন: জীবনের শুরুর দিকের আপনার যে সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সময়ের সাথে সাথে তাতে কী ধরণের বড় রূপান্তর বা পরিবর্তন এসেছে?
সৈয়দ আহসান কবীর: এটি পাঠিকা-পাঠক ভালো বলতে পারবেন।
প্রশ্ন: একজন লেখকের কি সমাজ বা রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, নাকি সাহিত্য কেবলই খাঁটি শিল্পের জন্য হওয়া উচিত?
সৈয়দ আহসান কবীর: মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন সাহিত্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সমাজ বা রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা না থাকলে লেখকের কলম মরে যাওয়া উচিৎ। অসির চে মসি শক্তিশালী। তাকে ব্যবহার করতে হবে শব্দবারুদে; তা সে প্রেম কিংবা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে।
প্রশ্ন: এমন কোনো লেখার স্বপ্ন কি আপনার আছে, যা আপনি এখনো লিখে উঠতে পারেননি কিন্তু একদিন লিখতে চান?
সৈয়দ আহসান কবীর: অনেক স্বপ্নই তো আছে, কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হয়। তার আগে দুটি অন্তুত শেষ করতে চাই। যশোরের সাহিত্যিক ও সাহিত্যকর্ম এবং এই অঞ্চলের সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের উদ্যোগ বিষয়ে অনেক আগে থেকেই একটি গবেষণা আমার চলমান। পেটের তাগিদে জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। তাই বছর দুই তাকে বন্ধ রাখতে হয়েছে। আমি সেই কাজটি শেষ করতে চাই, যদি মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই সুযোগ দেন। এ ছাড়া ‘আলো আঁধারের জোনাকিরা’ আমার উপন্যাস। যার প্রচ্ছদ তৈরি করিয়েছিলেন চমন প্রকাশের সত্তাধিকারী, কিন্তু আমি লেখা শেষ করতে পারিনি। বোধ হয় ১২ বছর হলো। সেই লেখাটি যদি খুঁজে পাই, তবে শেষ করতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার জীবনের এমন কোনো ঘটনা বা ট্র্যাজেডি আছে, যা আপনার লেখার পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
সৈয়দ আহসান কবীর: হা হা হা। বলবো না। কারণ, সেই মোড়ে আমার শব্দরা নীরবে বসে কেঁদেছে। আর আমি নির্বাক থেকেছি। ওই মোড়কে আর স্মরণ করতে চাই না। আবারও কবি আল মাহমুদের খড়ের গম্বুজের কাছে ফিরে গেলে শুনি, ‘পুরনো সে কথা উঠলে এখনও দহলিজে/সমস্ত গায়ের লোক নরম নীরব হয়ে শোনে।’
প্রশ্ন: ‘খড়ের গম্বুজ’এর পাঠক এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
সৈয়দ আহসান কবীর: পাঠের কোনো বিকল্প নেই। বই পাঠেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, প্রকৃতিকে পাঠ করুন। শিকড়কে ভোলা যাবে না, মানবিক অনুভবকে সাহিত্যে ধারণ করতে হবে। আমি-তুমি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের উদ্দেশে বলবো, ‘তোমাকে বসতে হবে এখানেই, এই ঠাণ্ডা ধানের বাতাসে’, যা ‘খড়ের গম্বুজ’ কবিতার বিখ্যাত পঙক্তি।