সাবরিনা মমতাজ
কেন লিখি বলাটা মুস্কিল।
আমার লেখার হাতে খড়ি ছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। আমাদের বাড়ি আর নানু বাড়ি, একই পাড়ায়। নানু বাড়ি আমার সময় বেশি কাটত। নানু আমাকে সবার থেকে আলাদা করেই দেখতেন। প্রতি হাটে আমার জন্য বিভিন্ন গল্পের বই কিনে আনতেন। আমি সবে ২য় শ্রেণির ছাত্রী, তখন সময়টা ১৯৯৪। গোপাল ভাঁড়, কালীদাস পন্ডিতের জটিল ধাঁধা ইত্যাদি-যদিও পড়তে খুবই বেগ পোহাতে হতো তবু চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। নানুর জাল বোনার অভ্যাস ছিল। তিনি জাল বুনতেন আর আমি গল্প পড়ে শোনাতাম।সেই থেকে পড়া হয়ে গেল এক অদৃশ্য নেশার মত।
বিকালে সবাই খেলত আমার বয়সী। কিন্তু আমার খেলা হতো না। একরকম ধমক দিয়েই আমাকে পাশে বসিয়ে রাখতেন নানু। অনিচ্ছাকৃত বানান করে করে গল্প পড়ে শোনানোই আমার খেলা ছিল। এভাবেই কাটতে লাগল নানুর সাথে আমার ছোট বেলা। ১৯৯৫ সালে নানু মারা গেলেন। আমি একা হয়ে পড়লাম। তখন আমি ৩য় শ্রেণির। নানুর সাথে সময় কাটানোর জন্য আমার কোনো সাথী ছিল না আগে থেকেই। এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি নানুর অনুপস্থিতি। একাকিত্ব যেন আমাকে নীরব করে দিল। আর কেউ হাটে নিয়ে যায় না, মিহি দানা (এক রকম মিষ্টি) এনে ডাকে না খেতে।
গল্পের বই নাই নুতন। পুরাতন বই ধরলেই পানিতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কিছুই ভালো লাগে না। কারো সাথে মিশতে ইচ্ছে করে না। নানু খুব ভালো মানুষ ছিলেন, পরিপাটি ভদ্রলোক কিন্তু লেখা পড়া জানতেন না। বিভিন্ন গল্প বলতেন। সে সব অনুভূতি আমাকে ভীষণভাবে ব্যাথিত করত। মনে হাজারো স্মৃতির কথা ঝরা ফুলের মত ঝরতে থাকত। তখন কলম ধরলাম, অতীতের সকল স্মৃতি রেকর্ড করতে থাকলাম। এভাবেই শুরু হয়েছিল আমার লেখার যাত্রা।
এখন লেখার পট পরিবর্তনে হয়েছে, শুধু নিজের অনুভূতি নয়, লিখি অন্যের চোখের জল, সুখের হাসি বেদনার রং কেমন হয়- সে অনুভব। লিখি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের উত্থান পতনের শেষ ও শুরুর দিক। লিখি আন্দোলনের ভাষায় প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা প্রতিটি বিপ্লবী মানুষের অনুভূতি দেখে তাদের কথা জানাতে সবাইকে। লিখি প্রেমের কলি না ফুটতে ঝরে যাওয়া কিছু যুগলের না পাওয়ার অনুভূতি শোনাতে।
আসলে লেখকের লেখার কারণ বিস্তর, আকাশ থেকে মর্ত্য। সকল কিছুরই ভেতরের নির্যাস নিংড়ে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে নিজের বিবেকের কিছু দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে শান্তি দিতে লিখি, লিখি নিজের জন্যও। লিখি আমার স্বাধীনতার ক্ষামতিটাকে লেখায় স্বাধীনতা দিতে। যেটা ইচ্ছে করলেই কেউ শৃংখলাবদ্ধ করতে পারবে না। বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার পাণ্ডুলিপি, ভস্মীভূত সব সাধের যাতনা সংরক্ষণ, লিখি সময়ের অনুভূতি, লিখি অতিরিক্ত অতীতের উদ্ভট ও গুরুত্বপূর্ণ আবেগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না হোক সেটাও কারণ। আসলে কত শত কারণে যে লেখক লেখে সেটার সঠিক উত্তর সঠিকভাবে দেওয়া সত্যি একটু কঠিনই বটে!
লেখক: কবি ও গদ্যকার