Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

কবি আজীজুল হক: লহ এ পুষ্পাঞ্জলি

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : সোমবার, ২ মার্চ,২০২৬, ১২:৫৪ এ এম
আপডেট : সোমবার, ২ মার্চ,২০২৬, ০১:৩৫ এ এম
কবি আজীজুল হক: লহ এ পুষ্পাঞ্জলি

‘‘আমারো প্রার্থনা ছিলো উচ্চারিত হৃদয়ের কাছে,

মেঘমুখী ফুল তুমি সূর্যমুখী হও,

সূর্যই আমাদের প্রথম নায়ক

চিরকাল আমাদের নায়কই সে আছে।’’

পরের ঋজু ও দীপ্যমান পঙ্ক্তিমালাটি পাঠ করলে অবলীলায় আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধুনিক বাংলা কবিতার এক নিভৃতচারী অথচ তেজস্বী শব্দশিল্পীর মুখ। তিনি কবি আজীজুল হক। আজ ২ মার্চ, বাংলা কবিতার এই মননশীল কবির জন্মদিন। নিভৃত মফস্বলে বাস করেও যে কেবল মেধা, প্রজ্ঞা আর মৌলিক শিল্পভাবনার জোরে আধুনিক বাংলা কবিতার মূলধারায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা যায়, কবি আজীজুল হক তার সারাজীবনের সাধনায় তা প্রমাণ করে গেছেন।

২.

কবি আজীজুল হকের সাথে আমাদের অনেকেরই অসংখ্য অমলিন স্মৃতি জড়িয়ে আছে। নব্বইয়ের দশকের কথা, তখন যশোরের দড়াটানা ব্রিজের উত্তর-পূর্ব অংশে ‘কালপত্র’ নামে একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান ছিল। দোকানটির মালিক ছিলেন বিভুতোষ রায়। সেই কালপত্রই ছিল আমাদের মতো তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা। সাধারণত কথাসাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ (যশোরে থাকলে), মাসুমুল আলম, কবি টিটো জামান, মারুফুল আলম, সৈকত হাবিব, মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, পাবলো শাহি, মাশুক শাহি, কবির মনি, দিলীপ ঘোষ (যিনি ঝিনাইদহ থেকে আসতেন), দুর্বাশা দুর্বার, মোজাই জীবন সফরি, শিকদার খালিদ, মহসিন রেজা, উইলিয়াম হাসান প্রমুখ আড্ডা দিতেন কবির সাথে। কালপত্রের সেই আড্ডা শেষে তিনি প্রায়ই চলে যেতেন প্রথিতযশা সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবলের অফিসে, অথবা তার অফিস থেকে ফিরে এসে আড্ডায় বসতেন। এটি ছিল কবির শেষ জীবনের দিনের একটা অংশের একধরণের রুটিন।

আমরা তরুণরা একজোট হয়ে কখনো কখনো তার বেজপাড়ার ভাড়া বাসায় হাজির হতাম। একাবর হলো কী, তিনি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন-আচ্ছা তোমরা কাকে বড় কবি মনে কর?

আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম-প্রথমত মধুসূদন, দ্বিতীয়ত রবীন্দ্র নাথ, তৃতীয়ত জীবনানন্দদাশ। বলা মাত্রই উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, নজরুল না কেন? আমরা আমতা আমতা করে অনেক কথা বললাম। নজরুলের কবিতা হয় না। কী অসাধারণ জীবনানন্দদাশ। আসলে তখন একটা ট্রেন্ড ছিল-জীবননান্দদাশ পাঠ নিয়ে। পরে অবশ্য কবি আজীজুল হক-আমাদের বিস্তারিত বোঝালেন নজরুলের গুরুত্ব সম্পর্কে। "অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা" প্রবন্ধ গ্রন্থে-'নজরুল ইসলাম: আসন ও নির্বাসন' শিরোনামে একটি প্রবন্ধ আছে। যথেষ্ঠ ঋদ্ধ আলোচনা। এখন আমরা আজীজুল হকের তীব্র অভাব অনুভব করি।   

কবির একটি বিশেষ অভিযোগ ছিল তার নামের বানান নিয়ে। অধিকাংশ মানুষ তার নামের বানানে হ্রস্ব-ই কার ব্যবহার করে ফেলতেন, যা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। তিনি আমাদের বলতেন, “ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আজীজুল হক বানানটি ঠিক করে দিয়েছেন। বলেছেন আমার নামের বানানে 'আজীজুল' এখানে দীর্ঘ-ই কার হবে। অথচ তোমরা ভুল করে কেন হ্রস্ব-ই কার দাও?” একবার যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক রানারে বিশেষ সংখ্যায় তার একটি লেখা ছাপা হয়।  শিকদার খালিদ ওই সংখ্যার দায়িত্বে ছিলেন। আহসান কবীর তখন বার্তাসম্পাদক, বাবু ভাই বলে যাকে সম্বোধন করি। সে সংখ্যায়  নামের বানান ভুলক্রমে -"আজিজুল হক" হয়ে প্রকাশ পায়। এতে তিনি ভীষণক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে বকা দিয়ে বলেছিলেন, “এই জন্য লোকাল পত্রিকায় লেখা দিই না।”

স্যারকে জড়িয়ে পাবলিক লাইব্রেরি, সাহিত্য পরিষদ, কালপত্র ও কেবল ভাইয়ের অফিস কেন্দ্রিক সেই স্মৃতিগুলো আজও আমাদের হৃদয়ে প্রোজ্জ্বল। আশির ও নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবিরা কোনো না কোনোভাবে তার সান্নিধ্যে উপকৃত হয়েছেন। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের প্রাণের দাবি থাকবে—তার জন্মদিন ও মৃত্যুদিন যেন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় করে পালন করা হয়।

৩.

তিনি আমাদের কেবল স্নেহ করতেন না, বরং নানা সময় ছন্দের জটিল সব কলাকৌশল শিখিয়ে দিতেন।  কবিতা যখন লিখছ তখন কবিতা বিষয়ক আলোচনার জন্য বই পড়তে হবে। তখন কার  বই পড়ব বললে বলতেন- পড়বা বুদ্ধদেব বসু, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ আলী আহসান ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। আসলে এরা প্রত্যেকে শক্তিমান কবি যেমন, তেমনি তুখোড় প্রবন্ধকার।

স্যারকে জড়িয়ে পাবলিক লাইব্রেরি, সাহিত্য পরিষদ, কালপত্র ও কেবল ভাইয়ের অফিস কেন্দ্রিক সেই স্মৃতিগুলো আজও আমাদের হৃদয়ে প্রোজ্জ্বল। আশির ও নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবিরা কোনো না কোনোভাবে তার সান্নিধ্যে উপকৃত হয়েছেন। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের প্রাণের দাবি থাকবে—তার জন্মদিন ও মৃত্যুদিন যেন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় করে পালন করা হয়।

কবি আজীজুল হক ১৯৩০ সালের ২ মার্চ তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমা (বর্তমান মাগুরা জেলা)-র শ্রীপুর থানার তারাউজাল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মুন্সী মোহাম্মদ জবেদ আলী এবং মা রহিমা খাতুন ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। গ্রামীণ শান্ত ও শ্যামল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কবির রক্তে মিশে ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ, আর হৃদয়ে ছিল অজানাকে জানার এক অদম্য ব্যাকুলতা।

আজীজুল হক ছিলেন বাংলা কবিতার উন্মেষকাল অর্থাৎ ‘পঞ্চাশের দশক’-এর অন্যতম অগ্রগণ্য কবি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কিংবা শহীদ কাদরীর মতো কবিরা যখন ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে দেশজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছিলেন, আজীজুল হক তখন তার কাব্যপ্রতিভার সমান দীপ্তি নিয়েও নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। রাজধানীর আলোকবৃত্তের বাইরে নিভৃত মফস্বলে অবস্থান করার কারণেই হয়তো দেশব্যাপী তার নামটি যতটা উচ্চকিত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। অথচ কাব্যভাষার আধুনিকতা এবং মননশীলতায় তিনি ছিলেন এই দশকের অন্যতম প্রধান কারিগর। রাজধানী-বিমুখ এই বৈষম্যের শিকার হয়েও তিনি তাঁর সৃজনে কখনো আপস করেননি।

অধ্যাপনাই ছিল কবি আজীজুল হকের জীবনের প্রধান ব্রত। ১৯৫৭ সালে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয়। তবে তার জীবনের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি অতিবাহিত হয়েছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৫৮ সালে তিনি এই কলেজের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন এবং টানা তিন দশক শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৮ সালে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। আজও তার অসংখ্য ছাত্র সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে তাঁর আদর্শের কথা প্রচার করছেন।

৪.

কবি আজীজুল হকের সাহিত্যিক পরিচয় কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর প্রবন্ধের বই পাঠ করলে বোঝা যায় তিনি কী অসামান্য মাত্রার পণ্ডিত ও চিন্তক ছিলেন। কবিতা নিয়ে তাঁর বোঝাপড়া ছিল বৈশ্বিক মানের। ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমি যখন তাঁকে পুরস্কৃত করে, তখন সেই পুরস্কারটি এসেছিল মূলত তাঁর প্রবন্ধের জন্য। তাঁর সেই অসাধারণ নিরীক্ষাধর্মী ও চিন্তাশীল প্রবন্ধের বইটির নাম ‘অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা’।

প্রাবন্ধিক আজীজুল হক তার এই বইয়ে বাংলা কবিতার বিবর্তন ও গন্তব্য নিয়ে যে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন, তা আজও আধুনিক তরুণ গবেষকদের কাছে দিশারি হয়ে আছে। পাণ্ডিত্য আর চিন্তার এমন শিখর স্পর্শ করেছিলেন বলেই তিনি নিছক একজন কবি হিসেবেই নন, বরং একজন মননশীল গবেষক হিসেবেও সমাদৃত। আধুনিক তরুণদের পঠনের বিষয় মধুসূদন, ফররুখ কিংবা সৈয়দ আলী আহসান হলেও, তাদের মননজগত ও আদর্শিক অনুপ্রেরণার ‘আইকন’ হলেন কবি আজীজুল হক। প্রাবন্ধিক ও কবি হিসেবে তার এই দ্বৈত প্রতিভাই তাকে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।

৫.

কবির কাব্যভাষায় একধরণের তীক্ষ্ণ ও বৈপ্লবিক আহ্বান লক্ষ করা যায়। তিনি যখন বলেন—

‘‘শতাব্দীর জ্ঞানের ফসল

বৃক্ষশাখে কিছু ফল আছে।

বললাম, আদি পাপ নে,

মাটিকে বিদীর্ণ কর, রক্ত আর ঘাম

সেইখানে ঢাল, ঢেলে

সুনীল প্রবাহ আন, সবুজ প্লাবন।

চারদিকে এত যুদ্ধ

যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা

কোনো এক যুদ্ধ চিনে নে,

চারদিকে টগবগ এত যে মিছিল

কোনো এক সঙ্গ বেছে নে।

স্খলিত স্বভাব তুই

কোনোদিন কোনোদিকে কোথাও গেলি না।’’

কবির এই দ্রোহ কেবল বহির্জগতের লড়াই বা রাজনীতির মিছিলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের গভীরতম পাপ, প্রেম এবং আত্মশুদ্ধির এক নিবিড় দহন। তাঁর কবিতায় এই যৌবনের দায়বদ্ধতা ফুটে উঠেছে এভাবে:

"বলেছি তো, কতোবার বলিনি কি তোকে প্রেম থাকে বুকের ভিতর, সেই বুক চাপড়ানো পাপ? শান্তি থাকে প্রাণের ভিতর সেই প্রাণে কষ্ট দেওয়া পাপ? স্বপ্ন থাকে চোখের ভিতর সেই চোখ ঢেকে রাখা পাপ?

এতো পাপ নিয়ে তোর কিসের যৌবন?"

কবির পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ। তিনি কেবল ধ্বংস নয়, বরং ধ্বংসের ভেতর থেকে এক নতুন সৃজনশীলতার স্বপ্ন দেখতেন। সালেহা বা হেনার মতো চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের এক চরম সত্যকে উন্মোচন করেছেন:

"সালেহার মুখ থেকে গাঢ় নীল অন্ধকারটুকু মুছে নে দু’হাতে, নদীর ভিতর-স্রোতে মিশিয়ে দে সেই অন্ধকার, নদী আরো নীলবর্ণ হবে, সেই জলে সিক্ত কর গোলাপের তৃষিত শিকড়, ফুল আরো রক্তবর্ণ হবে। ভুলে যা কৈশোর তুই। কিশোরী হেনাকে লেবু আর জামরুল পাতার আঘ্রাণে কেন যে খুঁজিস, হারালে নদীর চরে, বনের ভিতর, হেনারা আসে না আর জনপদে ফিরে, বুঝাবে কে, আত্মনাশী তুই।"

তার মনস্তাত্ত্বিক কাব্যভাষার আরও এক অনন্য উদাহরণ এই পঙ্ক্তিমালা:

"ঘুমে গেলেই দেখি স্বপ্নেরা তেড়ে আসে চতুর্দিক থেকে। ঘুম

তাদের প্রধান খাদ্য, যে-কোনো প্রকার ঘুম। এমন কি

যে-সব নিশ্চিন্ত ঘুম ক্যাপসুলে সুরক্ষিত থাকে, ছড়ায় সময়ে

সমুদ্রের শাদা নীল সোনালি গোলাপি ফেনা, পাতালে পতন-দৃশ্য

আঁকে অন্তহীন, মগজের কোষে-কোষে নীল-নীল ঝাঁঝালো শূন্যতা

ভরে দেয়, শঙ্খচূড় সর্পিণীর ডিমের কুসুম ক্রমে রক্তের ভিতরে

মিশে গিয়ে

গড়ে তোলে হলুদ চেতনা।"

এই পঙ্ক্তিমালা কবির কেবল গভীর পাণ্ডিত্য নয়, বরং সময়, সংগ্রাম এবং মানব-মস্তিষ্কের জটিল মনস্তত্ত্বের সাথে সংহতি প্রকাশের তীব্র আকুতি প্রকাশ করে। তাঁর কবিতায় স্থবিরতা বা আপসকামিতার কোনো স্থান ছিল না।

৬.

যশোরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানকার অধিকাংশ স্মারক ও ঐতিহ্যের সাথে আজীজুল হকের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। যশোরের স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমি’, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, যশোর ইনস্টিটিউট, কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত সাগরদাঁড়ির মধুমেলা—প্রতিটি স্পন্দনে তাঁর মেধা ও মননের ছাপ স্পষ্ট। সুরবিতান-এর মতো শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রের অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি।

কবি আজীজুল হক মনে করতেন, কবিতা কেবল কতগুলো শব্দের বিন্যাস বা ছন্দের কারসাজি নয়; এটি জীবনের এক গভীরতর সত্য। তিনি বলতেন:

“কবিতা জীবনের বস্তুঘটিত প্রয়োজনসিদ্ধির উপায় নয়, সে কেবল জীবনের ক্রমান্বিত শুভ-পরিণামসমূহ অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের চিত্তে গভীরতম তৃষ্ণা ও প্রত্যয়কে জ্বালিয়ে রাখে।”

কবির ‘মেঘমুখী সূর্যমুখী’ কবিতার সেই প্রার্থনা ছিল মানুষের চেতনার এক আমূল পরিবর্তনের আহ্বান। সূর্য এখানে আলো, ধ্রুব সত্য এবং সাহসের প্রতীক।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জীবনের শেষভাগে এই মহান কবিকে দারুণ অর্থকষ্টের মোকাবিলা করতে হয়েছে। যে কবি সারা জীবন মানুষকে আলোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তার শেষ দিনগুলো কেটেছে এক প্রকার অবহেলা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র বা সমাজ তার যোগ্য মর্যাদা বা নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলেও তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কাব্যিক গরিমা ধরে রেখেছিলেন আমৃত্যু। ২০০১ সালের ২৭ আগস্ট এই মহাপ্রাণ কবি আমাদের ছেড়ে চলে যান।

জীবনে স্বীকৃতি ও সম্মাননা যা পেযেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯): প্রবন্ধ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য, যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৮৬), সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫),মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৯), যশোর শিল্পীগোষ্ঠী পদক (১৯৯৪) ও চাঁদের হাট পদক (১৯৯৬)।

আজ তার জন্মদিনে আমাদের প্রার্থনা—মফস্বলের এই নিভৃতচারী সূর্যমুখী কবি যেন আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে আরও জীবন্ত হয়ে ওঠেন। রাজধানীর জৌলুস থেকে দূরে থাকা এই প্রাজ্ঞ কবির জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে, সত্যের সাধনা কখনো বৃথা যায় না। আশি ও নব্বই দশকের কবিরা তাকে যেভাবে হৃদয়ে ধারণ করেছেন, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা হে শব্দশিল্পী কবি আজীজুল হক। লহ এ পুষ্পাঞ্জলি!

 

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ: কবি ও গবেষক

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)