মুনীর মুসান্না
ভাষা কোনো দলীয় সিদ্ধান্তের ফসল নয়; ভাষা জন্ম নেয় মানুষের সম্মিলিত জীবন থেকে। মানুষের মুখে মুখে, অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে, বেদনা ও আশার মধ্যবর্তী এক গভীর সামাজিক স্রোতে ভাষা নিজেকে নির্মাণ করে। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভাষাকে সৃষ্টি করতে পারে না—কারণ ভাষার প্রকৃতি প্রসারিত হওয়া, সংযোগ স্থাপন করা, এবং মানুষের ভেতরের অপ্রকাশিত সত্যকে প্রকাশের পথ দেওয়া। ঘৃণা থেকে জন্ম নেওয়া শব্দ হয়তো ক্ষণিকের গালি হয়ে ওঠে, কিন্তু তা কখনো মানুষের অন্তর্জগতের স্থায়ী ভাষা হতে পারে না। ভাষার প্রকৃত আশ্রয় ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং সম্মিলিত চেতনায়, যুক্তির পরাকাষ্ঠায়, শ্লোগানের উচ্চারণে, ভদ্র আবেগের স্ফুরণে।
২.
বাংলা ভাষার ইতিহাস এই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। চর্যাপদ–কে আমরা বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করি, কিন্তু বাংলা ভাষার মৌখিক ঐতিহ্য তারও বহু পূর্বে বিস্তৃত ছিল। গ্রামবাংলার পুথি, গাজীর গান, কারবালার করুণ কাহিনী, এবং লোকজ আখ্যান—সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন শব্দ, নতুন অনুভূতি এবং নতুন প্রকাশভঙ্গি অর্জন করেছে। ভাষা কখনো স্থির থাকে না; সে প্রবাহমান, নদীর মতো, যে নিজের গতিপথে নতুন মাটি স্পর্শ করে, নতুন সুর ধারণ করে যুগ যুগ ধরে।
বাংলা ভূখণ্ডে যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের আগমন ঘটেছে—ব্যবসা, দখল, রাজনীতি, কিংবা সামাজিক যোগাযোগের সূত্রে। এই বহুমাত্রিক সংস্পর্শ বাংলা ভাষাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, এমনকি ইউরোপীয় ভাষার শব্দও বাংলার শরীরে মিশে গিয়ে আজ আমাদের নিজস্ব ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে। এই শব্দগুলো আর পর নয়—এগুলো আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার, আমাদের আনন্দ ও বেদনার ভাষা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও কবিতার আবেদনে অনন্য শিল্পের স্তম্ভ।
এই ভাষার উদারতা আমরা স্পষ্টভাবে দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর সৃষ্টিতে। তাঁর গীতাঞ্জলি কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং বহুসূত্রে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষার আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক পরিণতির এক অনন্য নিদর্শন। উপনিষদের ভাব, লোকজ অনুভূতি, এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধি—সব মিলিয়ে তাঁর ভাষা হয়ে উঠেছে সমগ্র বাঙালির ভাষা। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। তাঁর ভাষা ছিল বিদ্রোহের, কিন্তু সেই বিদ্রোহ ভাষাকে সংকুচিত করেনি—বরং বিস্তৃত করেছে। তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলো আজ আর বিদেশি নয়, বরং বাংলা ভাষার অন্তর্গত শক্তির অংশ।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় আরবি ও ফারসি শব্দের যে প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল বাংলা ভাষার শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার এক সচেতন ও যৌক্তিক প্রচেষ্টা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, গণমানুষের বিদ্রোহ, সাম্য এবং ত্যাগের মহিমা প্রকাশের জন্য প্রচলিত তৎসম শব্দের বাইরেও এক ধরনের পৌরুষদীপ্ত শব্দের প্রয়োজন। তাঁর লেখনীতে আরবি-ফারসি শব্দগুলো কেবল ধর্মীয় অনুসঙ্গ হিসেবে আসেনি, বরং শোষিত মানুষের হৃদয়ের আগুনকে ভাষা দিতে ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদী’ বা ‘কোরবানি’র মতো শব্দগুলো অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। নজরুলের এই শব্দচয়ন বাংলা ভাষাকে সংকুচিত করেনি, বরং এক নতুন তেজ ও সর্বজনীন বিস্তৃতি প্রদান করেছে, যা ভাষাকে সরাসরি জীবনের ময়দানে টেনে এনেছে।
৩
সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই চব্বিশের গণ বিপ্লবের শিরোনাম স্থানীয় ভাষা “আজাদী” বা মুক্তির সংগ্রামের ভাষা আমাদের সামনে নতুন এক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে। সংগ্রামের মিছিলে, প্রতিবাদের স্লোগানে, মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশে কিছু শব্দ নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে। এই শব্দগুলো কোনো কৃত্রিম প্রয়োগ নয়; এগুলো মানুষের অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। প্রথমে হয়তো এগুলোকে নতুন বা ভিন্ন মনে হয়েছে, কিন্তু মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে হতে, এই শব্দগুলো আজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
ভাষার এই রূপান্তর কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন। যখন কোনো জনগোষ্ঠী গুম, জুলুম থেকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় একত্রিত হয়, তখন তাদের অভিজ্ঞতা নতুন শব্দের জন্ম দেয়। এই শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এগুলো একটি কওমের মানুষের আশা, প্রতিরোধ, এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ সমালোচনা ভাষার এই স্বাভাবিক বিকাশকে থামাতে পারে না। কারণ ভাষা কোনো একক মালিকানার বিষয় নয়; ভাষা জনগণের।
আজ “আজাদী”, “মুক্তি”, “হক”, কিংবা “সংগ্রাম”—এসব শব্দ কেবল অভিধানের শব্দ নয়; এগুলো মানুষের জীবনের অংশ। এগুলো মিছিলে উচ্চারিত হয়েছে, কবিতায় রূপ পেয়েছে, এবং ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে উঠেছে। এটাই ভাষার প্রকৃত শক্তি—সে মানুষের জীবন থেকে জন্ম নেয়, গুম হয়ে গুমরে মরে এবং আবার মানুষের জীবনেই ফিরে আসে।
অতএব, ভাষার ওপর কোনো কৃত্রিম কাটাছেঁড়া বা নয়া বন্দোবস্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ভাষা নিজেই তার পথ নির্মাণ করে—মানুষের কণ্ঠে, মানুষের সংগ্রামে, মানুষের স্বপ্নে। আজাদীর লড়াইয়ে ব্যবহৃত শব্দগুলো তাই নতুন নয়; এগুলো আমাদেরই ভাষার নতুন জাগরণ, আমাদের সম্মিলিত চেতনার নতুন প্রকাশ। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—ভাষা এখানে মুক্তিরই আরেক নাম।
মুনীর মুসান্না: কবি, গল্পকার