❒ বুরকিনা ফাসো-তে কৃষিক্ষেত্রে পারমাণবিক বিজ্ঞানের সাফল্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাঞ্জোনের ধান উৎপাদন এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে মূল্যায়ন করা নতুন মিউট্যান্ট ধানের একটি জাতের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষি প্রকৌশলী ও পিএইচডি গবেষক গ্লোরিয়া কাব্রে। ওই এলাকায় জাতটির হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ ফলন হয়েছে ১১.৭৬ টন ছবি: বি. সানোঁ/জোসেফ কিয়েরি বিশ্ববিদ্যালয়
বুরকিনা ফাসোর কৃষকদের ধান চাষের যাত্রা এখন আর কেবল জমিতে বীজ বুননের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, বরং এর সূচনা ঘটছে গবেষণাগারের বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে। দেশটির বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের আটটি নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা আফ্রিকার এই দেশটির কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগ ‘অ্যাটমস৪ফুড’-এর সহায়তায় অর্জিত এই সাফল্য দেশটিতে স্থানীয়ভাবে চালের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পথ সুগম করেছে।
গত এক দশকে বুরকিনা ফাসোতে চালের সামগ্রিক ভোগ বা ব্যবহার দ্বিগুণ হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় অর্ধেক চালই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে দেশটির ‘জাতীয় ধান প্রজনন কর্মসূচি’ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষির ওপর জোর দেয়। এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা ‘মিউটেশন ব্রিডিং’ বা রূপান্তর প্রজনন পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যেখানে নিয়ন্ত্রিত বিকিরণ (রেডিয়েশন) ব্যবহার করে উদ্ভিদের প্রাকৃতিক জিনগত বৈচিত্র্য তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হয়। আইএইএ-এর প্রযুক্তিগত ও বিশেষজ্ঞ সহায়তায় ল্যাবরেটরি থেকে মাঠপর্যায়ের ট্রায়াল সম্পন্ন করে ২০২৫ সালে আটটি নতুন জাত আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো প্রচলিত ধানের চেয়ে বহুগুণ কার্যকর ও লাভজনক। দেশটিতে প্রচলিত ধান যেখানে হেক্টরপ্রতি মাত্র ৪ থেকে ৬ টন ফলন দেয় এবং তা পাকার জন্য দীর্ঘ সময় লাগে, সেখানে নতুন জাতগুলো থেকে হেক্টরপ্রতি ৯ থেকে ১১ টন পর্যন্ত চাল উৎপাদন সম্ভব। শুধু তাই নয়, এসব ধান মাত্র ৯৫ থেকে ১০৬ দিনের মধ্যেই পরিপক্ব হয়ে ওঠে। কেবল বেশি উৎপাদনই নয়, ভোক্তাদের রুচি ও স্থানীয় বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে ২টি বড় দানার, ২টি প্রতিরোধী শ্বেতসারসমৃদ্ধ এবং ১টি মোমের মতো আঠালো বৈশিষ্ট্যের চাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জোসেফ কি-জেরবো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমায়েল অঁরি নেস্তর বাসোলে এবং যৌথ এফএও-আইএইএ কেন্দ্রের পরিচালক দংশিন ফেং জানান, এই সাফল্য কেবল নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমিত নয়; এর মাধ্যমে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক গবেষণা সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণাগারের সাফল্যকে কৃষকের মাঠে নিয়ে যেতে বর্তমানে বামা ও বানজোনের মতো প্রদর্শনী ক্ষেত্রগুলোতে পরীক্ষামূলক চাষ ও বীজ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পরমাণু বিজ্ঞানের এই টেকসই প্রয়োগ বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।