❒ বাউল চিন্তা ও ইসলাম-৩
ড. জামিল মাসরুর
(পূর্বপ্রকাশের পর)
বাউল সাধনার অন্যতম ভয়াবহ গলদ হলো গুরু বা মুর্শিদকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা প্রদান। বাউলরা গুরুকে স্রষ্টার সমতুল্য বিবেচনা করে, কারণ তারা মনে করে গুরুর নির্দেশ ছাড়া আত্মজ্ঞান লাভ কঠিন । গুরুকে ভজনা করার মধ্য দিয়েই সৃষ্টিকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করা যায়। এই চরম গুরুবাদের প্রকাশ ঘটে তাদের একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে: "যেহি মুর্শিদ সেই তো রাছুল, ইহাতে নেই কোন ভুল, খোদাও সে হয়" ।
এই চরমপন্থী গুরুবাদ ইসলামের তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিছু চরমপন্থী বাউল লালনকে তাদের নবী মনে করে এবং তাদের কালিমায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে: "লাইলাহা ইল্লাল্লাহ লালন রাসূলুল্লাহ" । বাউলরা আরবি শব্দাবলী (মুর্শিদ, রাসূল, খোদা) ব্যবহার করলেও, তারা এর মূল ধর্মতাত্ত্বিক অর্থকে বিকৃত করে গুরুবাদের প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা এই ধারণাকে 'কোরআনের কথা' বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে , যা ধর্মীয় বিকৃতির ইঙ্গিত বহন করে। এই বিকৃতি প্রমাণ করে যে বাউলরা শুধুমাত্র বাহ্যিক আচার বর্জন করেনি, বরং তারা ইসলামের মূল বিশ্বাসকে ভিতর থেকে প্রতিস্থাপন (substitution) করতে চেয়েছে, যাতে তাদের গুহ্য সাধনার নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়।
শিরকের ধারণা: ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে, ইবাদত এবং আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করাকে শিরক বলা হয়। গুরুকে সৃষ্টিকর্তা বা রাসূলের সমতুল্য ভাবা ইসলামের তাওহীদে উলুহিয়াহ (একমাত্র ইবাদতের অধিকার) এবং তাওহীদে রিসালাত (নবীদের মর্যাদা) এর চরম লঙ্ঘন।
কোরআন ও হাদিস ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে (গ্লু/Ghulu)। আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে অমূলক সীমালংঘন করো না" (সূরা মায়িদাহ: ৭৭) । ইতিহাস সাক্ষী, নূহ (আ.)-এর উম্মতরা যেমন তাদের বুযুর্গদের (ওয়াদ্দ্, সুওয়া' ইত্যাদি) প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি দেখাতে গিয়ে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল, যা শিরকে পরিণত হয়েছিল । বাউলদের গুরুবাদও একই ঐতিহাসিক ভুল।
পড়ুন আগের কিস্তি : বাউল চিন্তা ও ইসলাম-২ বাউলের প্রধান গলদসমূহ–দেহতত্ত্ব ও শরিয়ত বিরোধিতা
এছাড়া, বাউলদের কাছে সাঁইজির মাজার তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য । মাযারকে কেন্দ্র করে আহবান, ফরিয়াদ, রুকু, সিজদাহ, তাওয়াফ, বা মানত দেওয়া—যা বাউলসহ বিভিন্ন মাযারকেন্দ্রীক সমাজে প্রচলিত—এগুলো সবই ইসলামের দৃষ্টিতে বড় শিরক বা অংশীদারিত্ব স্থাপন। যেহেতু ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট (সূরা গাফির: ৬০), তাই অন্য কারো শরণাপন্ন হওয়া বা মানত দেওয়া ইসলামের মূল আকিদার পরিপন্থী। (চলবে)