❒ বাউল চিন্তা ও ইসলাম-২
ড. জামিল মাসরুর
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দেহতত্ত্বের স্বরূপ ও 'আনাল হক' ধারণা: স্রষ্টা-সৃষ্টির ঐক্য এবং তাওহীদের লঙ্ঘন
বাউল দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক গলদটি নিহিত রয়েছে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সত্তাকে একীভূত করার ধারণায়। বাউলরা দেহকে ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ড (বিশ্ব-পাত্র) বলে মনে করে। তাদের মতে, দেহের বাইরে কোনো আলাদা পরমসত্তা নেই; বরং দেহের মধ্যেই আল্লাহ, কৃষ্ণ, ব্রহ্মা, পরমাত্মা—সকল সত্তার মিলন ঘটে । এই দর্শনই 'আনাল হক' (আমিই সত্য) বা নিজেকে ঈশ্বরতুল্য ভাবার চিন্তাধারার জন্ম দেয়।
ইসলামি আকিদার মূল স্তম্ভ হলো তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব)। ইসলামে আল্লাহ অদ্বিতীয়, অনাদি এবং সৃষ্টির ঊর্ধ্বে। স্রষ্টার সত্তা এবং সৃষ্টির সত্তা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। স্রষ্টাকে সৃষ্টির সঙ্গে একীভূত মনে করা, বা নিজেকে ঈশ্বরতুল্য ভাবা—যা বাউলতত্ত্বে প্রচলিত—ইসলামের মৌলিক আকিদার সঙ্গে চূড়ান্তভাবে সাংঘর্ষিক এবং এটি সরাসরি শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারিত্ব স্থাপন । এই দর্শন তাওহীদ ও রিসালাত উভয় স্তম্ভকেই বাতিল করে দেয়। কারণ যদি স্রষ্টা দেহের মধ্যেই নিহিত থাকেন, তবে বহিরাগত কোনো ঐশী বিধান বা নবীর (রাসূল) বার্তার কোনো আবশ্যকতা থাকে না।
ধর্মগ্রন্থ, মন্দির-মসজিদ এবং বাহ্যিক আচারের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান
বাউল দর্শনে যেহেতু দেহের মধ্যেই পরমসত্তার উপলব্ধিই মুখ্য, তাই বাহ্যিক উপাসনা, ধর্মীয় গ্রন্থ এবং সামাজিক রীতিনীতি অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বাউলরা ঘোষণা করে যে তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও শরিয়তি ইসলামের প্রথাগত অনুশাসন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা থেকে সরে এসে নিজেদের মনের মতো পথ তৈরি করেছে । তারা মসজিদ বা মন্দিরে উপাসনা করে না, ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রের বিধান মানে না । তাদের শিক্ষায় আল্লাহ, নবী, কোরআন বা শরিয়ত-কানুনের বাধ্যতামূলক আনুগত্য নেই। তারা বিবাহবহির্ভূত জীবন যাপন করে এবং মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতিতে দাফন বা দাহ কার্যও সম্পন্ন করে না ।
বাউলদের এই সর্বাত্মক প্রত্যাখ্যান কেবল স্বাধীনতার প্রকাশ নয়; বরং এটি তাদের দেহতত্ত্বের অনিবার্য ফল। যদি দেহের অভ্যন্তরেই সকল মুক্তি ও জ্ঞান নিহিত থাকে, তবে বাহ্যিক ঐশী আইন (শরিয়ত) মেনে চলার মেটাফিজিক্যাল ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। তারা এমনকি লিখিত কোরআনে বিশ্বাস না করে তাদের সিনায় সিনায় থাকা দেল কোরআন-এ বিশ্বাস করে । ইসলামের মূল কথা হলো আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ (ইসলাম) এবং তাঁর প্রেরিত বিধান তথা শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ। শরিয়তের এই প্রত্যাখ্যানই বাউল মতকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ।
বাউল সাধনার বিতর্কিত আচার: 'যুগল গুপ্ত সাধনা' এবং 'আরোপ-তত্ত্ব'-এর গুহ্য দিক
বাউল সাধনার পদ্ধতিগত গলদগুলো চরম নৈতিক বিচ্যুতি সৃষ্টি করেছে। বাউল সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুগল গুপ্ত সাধনা, যেখানে নারী অপরিহার্য সাধন সঙ্গিনী হিসেবে বিবেচিত হন (সেবাদাসী) । গবেষকদের মতে, এই সাধনা গুরু-নির্ভর বা গুরুমুখী বিদ্যা, এবং একজন বাউলের একাধিক সেবাদাসী থাকতে পারে । এই সহবাসকে সাধনার একটি অপরিহার্য অংশ বলে মনে করা হয় ।
এই সাধনার ঘোষিত লক্ষ্য হলো প্রাকৃত কাম বা জাগতিক যৌন বাসনাকে অতিক্রম করে অপ্রাকৃত প্রেম বা রস অর্জন করা । এই প্রক্রিয়ায় তন্ত্র-নির্ভর বামাচারী যোগ-ক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া হয়, যার মধ্যে চারিচন্দ্র ভেদ বা লতা সিদ্ধির মতো গুহ্য আচার অন্তর্ভুক্ত । গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, বাউল বা তান্ত্রিক সাহিত্যে লতা শব্দটি নারীর যৌনাঙ্গের পারিভাষিক অর্থ বহন করে । আরও গুরুতরভাবে, বাউলরা শুক্র বা বীর্যকে ঈশ্বর আখ্যায়িত করে এবং সিদ্ধি অর্জনের জন্য তা ভক্ষণ করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে । বাউলরা এই যৌনাচারকে ভক্তি ও উপাসনার একটি পবিত্র অনুষ্ঠান বললেও, প্রচলিত ধর্মশাস্ত্র এবং বিশেষত ইসলামের কঠোর নৈতিক কাঠামো ও শরিয়তি বিধানের সঙ্গে এটি সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। ইসলামে বিবাহ বহির্ভূত সহবাস (যিনা) সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নাজায়েজ ।
বাউল মতবাদের সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে সমালোচনার সারসংক্ষেপ
মূলধারার ইসলামি এবং সমাজের রক্ষণশীল পক্ষ বাউল মতবাদকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি একটি রুচিহীন নিকৃষ্ট যৌন মতবাদ, যা কিছু অসভ্য বিজাতীয় দর্শনের সমন্বয়ে জন্ম নিয়েছে এবং সমাজে যৌনবৃত্তি ছড়ানোই এর মূল কাজ । এই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেহতত্ত্বকে ভিত্তি করে গুহ্য তন্ত্রাচারে লিপ্ত হওয়া, যা সমাজের নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়।
বাউলতত্ত্বের মূল ধারণা বনাম ইসলামী আকিদার সাংঘর্ষিক ক্ষেত্র
| বাউল দর্শন (দেহতত্ত্ব) | ইসলামী আকিদা (তাওহীদ ও শরিয়ত) | সংঘাতের প্রকৃতি |
| দেহের অভ্যন্তরেই স্রষ্টার সন্ধান, দেহ 'দেউল' (ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ড) | আল্লাহ অদ্বিতীয়, সৃষ্টির ঊর্ধ্বে; তাওহীদের মূলনীতি (উলুহিয়াত ও রুবুবিয়াত) | স্রষ্টার সত্তাকে সৃষ্টির সঙ্গে একীভূত করা (শিরক) |
| গুরু/মুর্শিদ খোদা বা রাসূলের সমতুল্য (যেহি মুর্শিদ সেই তো খোদা/রাসূল) | একমাত্র ইবাদতকারী আল্লাহ, রাসূল হলেন বার্তাবাহক (রিসালাত) | ইবাদত ও আনুগত্যের অধিকারের চরম লঙ্ঘন (শিরক) |
| বিবাহবহির্ভূত যুগল গুপ্ত সাধনা (লতা সিদ্ধি, কামকে প্রেম ভাবা) | বিবাহ বহির্ভূত সব সম্পর্ক হারাম ও পাপ (যিনা) | নৈতিকতা ও শরিয়তের মৌলিক কাঠামো বাতিল |
| আত্মজ্ঞানই চূড়ান্ত, বাহ্যিক শরিয়ত অপ্রয়োজনীয় | শরিয়ত হলো জীবনবিধান; এর পূর্ণ অনুসরণ আবশ্যক (তাসলিম) | ইসলামের মূল ভিত্তির অস্বীকার |
(চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিংকে- বাউল চিন্তা ও ইসলাম-১ বাউল সাধনা ও ইসলামি ধর্মতত্ত্বের সংঘাত