Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, পুনর্বাসনে কি পরাজয়?

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : সোমবার, ১০ আগস্ট,২০২৬, ১০:৪১ এ এম
আপডেট : সোমবার, ১০ আগস্ট,২০২৬, ১১:১৭ এ এম
ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, পুনর্বাসনে কি পরাজয়?

ছবি: এআই প্রণীত

'আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!'

না, কবি জীবনানন্দ দাশের মতো এমন কাব্যিক কোনো বেদনা জাগাতে আসিনি। আজ একটা সত্য উচ্চারণ করতে চেয়েছি। বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার এখন আর কেবল মাদক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবার ও রাষ্ট্রের নীতিব্যবস্থার জন্যও বড় সংকেত। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হয়েছে, কঠোর আইনও হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এই প্রশ্নটি এখন সামনে আনা জরুরি।

কারণ একটি পরিবার যখন মাদকাসক্ত সদস্যকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠায়, তখন সেটি তার শেষ আশ্রয়ের মতো। দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, টাকা-পয়সা হারানো, ঘুমহীন রাত, পারিবারিক অশান্তি, আচরণের পরিবর্তন এবং বারবার ভেঙে যাওয়া প্রতিশ্রুতির পর পরিবারটি এমন একটি জায়গা খোঁজে, যেখানে কেউ দায়িত্ব নেবে। রোগীকে মাদক থেকে দূরে রাখা হবে, নিয়মিত জীবনযাপন তৈরি হবে, চিকিৎসক ও কাউন্সেলর থাকবেন—এটাই প্রত্যাশা।

কিন্তু গেট বন্ধ হওয়ার পর যদি বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার বিপরীত হয়, তাহলে পুনর্বাসন আর মুক্তির পথ থাকে না; সেটি হয়ে উঠতে পারে আরেক ধরনের বন্দিদশা।

বাংলাদেশের মাদক পুনর্বাসন ব্যবস্থার সাম্প্রতিক চিত্র এ আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬,১০০ শয্যাবিশিষ্ট ৩৮৬টি বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র ছিল। এর প্রায় অর্ধেকই ঢাকায়। আবার ১৫টি জেলায় কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্র ছিল না। সরকারি ব্যবস্থায় ছিল মাত্র চারটি চিকিৎসাকেন্দ্র, যার আনুষ্ঠানিক ধারণক্ষমতা ১৯৯ শয্যা।

কিন্তু সমস্যা শুধু শয্যার সংখ্যা নয়। প্রশ্ন হলো—সেই শয্যার পাশে কতজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, নার্স ও আসক্তি-বিষয়ক কাউন্সেলর আছেন?

ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদক চিকিৎসা কেন্দ্রের একটি পরিদর্শনের তথ্য আরও হতাশাজনক। ২৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে পূরণ হয়েছিল মাত্র দুটি। অনুমোদিত ১৫টি পদের বিপরীতে ছিলেন একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ; কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ছিলেন না এবং ছিলেন পাঁচজন নার্স। প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা ও জরুরি বিভাগও ছিল না।

এটি নিছক জনবল সংকট নয়; এটি আসক্তি চিকিৎসার মৌলিক দর্শনের সংকট।

আসক্তি মানে শুধু একজন মানুষকে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস মাদক থেকে দূরে রাখা নয়। মাদকনির্ভরতার সঙ্গে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, মানসিক বিকার, ট্রমা ও পারিবারিক অকার্যকারিতা সহাবস্থান করতে পারে। কেউ কেউ হয়তো কোনো গভীর মানসিক যন্ত্রণা থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে মাদকের আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে মাদক সরিয়ে দিলেই মূল সমস্যার সমাধান হয় না।

আরোগ্যের জন্য প্রয়োজন মানসিক ও শারীরিক মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি, ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং, পরিবারের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ। অথচ বাংলাদেশের অনেক পুনর্বাসনকেন্দ্রে এসব সেবা কতটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেওয়া হয়, তার স্বচ্ছ জাতীয় তথ্য নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় উঠে এসেছে কিছু সাবেক রোগীর অভিজ্ঞতায়। প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন জানিয়েছেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকার সময় তাঁরা মাদক সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য ও যোগাযোগ পেয়েছেন, যা আগে তাদের জানা ছিল না। একজন সাবেক রোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য রোগীদের কাছ থেকেই তিনি বিভিন্ন মাদক ও সেগুলো কোথায় পাওয়া যায় সে সম্পর্কে বেশি জেনেছেন।

এখানে তৈরি হয় এক ভয়ংকর বৈপরীত্য। যে প্রতিষ্ঠান একজন মানুষকে মাদকের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথা, সেটিই যদি অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাকে সেই জগতের নতুন পরিচিতি ও যোগাযোগের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাহলে পুনর্বাসন নিজেই ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য সমবয়সী আসক্তি থেকে পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। যারা নিজেরা আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা অন্য রোগীর জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর তত্ত্বাবধান ও সুস্পষ্ট কাঠামো। তা না হলে অভিজ্ঞতা বিনিময় পরিণত হতে পারে মাদক সংস্কৃতির অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায়।

আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন হলো রোগীর অধিকার ও সম্মতি। কিছু সাবেক রোগী এবং একজন কাউন্সেলর অভিযোগ করেছেন, কখনও কখনও রোগীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভর্তি করা হয়েছে কিংবা যথাযথ মূল্যায়ন ও অবহিত সম্মতি ছাড়া ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে না পারলেও, অভিযোগগুলোও উপেক্ষা করা যায় না।

কারণ একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে অস্থিতিশীল, নেশাগ্রস্ত কিংবা পারিবারিক সংঘাতের মধ্যে থাকতে পারেন। তাঁকে একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার পর তাঁর দৈনন্দিন জীবন ও চিকিৎসা প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে সেখানে জবাবদিহি ও মানবিক সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযানও দেখিয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান যথাযথ অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় পাঁচটি লাইসেন্সবিহীন পুনর্বাসন কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আদাবরের মাইন্ড এইডের ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর পর অভিযানটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। পরবর্তী পরিদর্শনে কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও পরিচারকের ঘাটতিও ধরা পড়ে।

অর্থাৎ সমস্যা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি কেন্দ্রের নয়; সমস্যা কাঠামোগত।

বাংলাদেশের মাদকনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত আইনশৃঙ্খলা ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হয়েছে। ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযান তার বড় উদাহরণ। অভিযান, গ্রেপ্তার ও মাদক জব্দ—সবই হয়েছে। কিন্তু মাদকের চাহিদা কমানোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য: মাদক নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু মাদকনির্ভর মানুষের চিকিৎসার সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

ইয়াবা এই বৈপরীত্যকে আরও তীব্র করেছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনযুক্ত এই ছোট ট্যাবলেট বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। বছরের পর বছর জব্দ ও গ্রেপ্তারের পরও এর প্রাপ্যতা কমেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর সহজলভ্যতা ও তরুণদের মধ্যে বিস্তারের কথা উঠে এসেছে। মিয়ানমারকে এর প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অতএব শুধু সীমান্তে পাহারা বাড়িয়ে কিংবা মাদক জব্দ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মাদকনির্ভর মানুষের জন্য বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চিকিৎসাব্যবস্থাও প্রয়োজন।

এখানে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আসক্তিকে কেবল নৈতিক ব্যর্থতা বা অপরাধ হিসেবে দেখলে চিকিৎসার প্রয়োজনটি আড়ালে পড়ে যায়। আসক্তি একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা—যার চিকিৎসায় প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, পেশাদারিত্ব ও সামাজিক সহায়তা।

পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে একজন রোগী আবার সেই একই বাস্তবতায় ফিরে যান। সেখানে হয়তো মাদক সহজলভ্য, পুরোনো বন্ধু ও যোগাযোগ সক্রিয়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে, কর্মসংস্থান নেই এবং চিকিৎসাবিহীন মানসিক সমস্যাও রয়ে গেছে। আবাসিক চিকিৎসার সময় যে রুটিন তাঁকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল রেখেছিল, বাইরে এসে সেটিও আর থাকে না।

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—পুনর্বাসন শেষ হয় কখন?

গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার দিন নয়। বরং সেদিনই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা। রোগীকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া, কর্মজীবনে যুক্ত করা, মানসিক চিকিৎসা অব্যাহত রাখা, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং পুনরায় আসক্তির ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ—এসব ছাড়া আবাসিক চিকিৎসা অসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই শুধু আরও পুনর্বাসনকেন্দ্র নয়; আরও ভালো পুনর্বাসনব্যবস্থা। প্রতিটি কেন্দ্রের চিকিৎসার মান, প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা, রোগীর অধিকার, সম্মতির নীতি, চিকিৎসার ফলাফল এবং পুনরায় আসক্তির হার সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুনর্বাসনকে আটকের সমার্থক বানানো যাবে না।

ইয়াবার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু ইয়াবা জব্দের লড়াই নয়। এটি একজন তরুণকে তার জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। রাষ্ট্র যদি মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে চায়, তাকে সীমান্ত পাহারা দিতে হবে; কিন্তু মাদকনির্ভর মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হলে চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার ও সমাজ—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

নইলে আমরা হয়তো বলতে পারব—কত ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি মাদক ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফিরতে চেয়েছিল, তার গল্পটি থেকে যাবে অন্ধকারেই।

পুনর্বাসনের দরজা শুধু বন্ধ করার জন্য নয়, খুলে দেওয়ার জন্য। সেই দরজা দিয়ে একজন মানুষ যেন মাদক থেকে বেরিয়ে এসে আবার একই অন্ধকারে ফিরে না যায়—সেটিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের মাদকনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্যের মাপকাঠি।

লেখক: কবি ও গবেষক,  ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)