বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ইএ গেমস কোম্পানির সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম 'এফসি ২০২৬' ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও গেম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক আর্টস (ইএ) বিক্রির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সৌদি আরবের সার্বভৌম ফান্ড 'পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড' (পিআইএফ)-এর নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম ৫,৫০০ কোটি ডলারে (প্রায় ৪,১০০ কোটি পাউন্ড) মার্কিন এই গেমিং জায়ান্টকে কিনে নিয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটিকে 'প্রাইভেট' করে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে শেয়ারবাজারে এর সাধারণ শেয়ার লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। এটি ভিডিও গেমের ইতিহাসে অন্যতম এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘লিভারেজড বাইআউট’ বা ঋণনির্ভর অধিগ্রহণ চুক্তি।
এই চুক্তির বড় অংশই পরিশোধ করা হচ্ছে ধার করা অর্থে। পিআইএফ নিজস্ব ৩৬ কোটি ডলারের বাইরেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান থেকে ২,০০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, যার সমস্ত দায়ভার এখন চাপবে খোদ ইএ-র ওপরই। বিশাল এই ঋণের বোঝা মেটাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে অনুমান করছেন বিশ্লেষকরা। ব্লুমবার্গের গেমিং প্রতিবেদক জেসন শ্রাইয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, ঋণের চাপ সামলাতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই, গেমের ভেতর অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের পথ খোঁজা (অ্যাগ্রেসিভ মনিটাইজেশন) এবং খরচে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হতে পারে।
এছাড়া চুক্তিটিতে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের নেতৃত্বাধীন 'অ্যাফিনিটি পার্টনার্স'-ও বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছে। ফলে প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোর আগ্রাসী নীতির কারণে ব্যবসায়িক পরিচালনায় নতুন মালিকদের সরাসরি হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ইএ-র ঝুড়িতে ইএ এফসি (সাবেক ফিফা), দ্য সিমস এবং মাস ইফেক্টের মতো সফল সব মেগা-ফ্র্যাঞ্চাইজি যেমন রয়েছে, তেমনি তুলনামূলক ছোট ও বৈচিত্র্যময় ইনডি গেমও তৈরি করে তারা। তবে নতুন মালিকানার অধীনে ঝুঁকি না নিয়ে শুধু 'নিরাপদ বাজি' অর্থাৎ বড় গেমের সিক্যুয়েল তৈরিতেই নজর দেওয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন 'অ্যারোহেড গেম স্টুডিওস'-এর সিইও শামস জুরজানি। এতে গেমিং ক্যাটালগের বৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন তিনি।
অন্যদিকে, মানবাধিকার এবং কন্টেন্ট সেন্সরশিপ নিয়েও তোলপাড় শুরু হয়েছে গেমারদের মধ্যে। ইএ-র অন্যতম জনপ্রিয় গেম 'দ্য সিমস'-এ এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) সম্পর্ক ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলোকে বেশ প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু সৌদি আরবের শরিয়াহ আইনে সমকামিতা মৃত্যুদণ্ড ও বেত্রাঘাতযোগ্য অপরাধ। ফলে সৌদি মালিকানায় আসার পর বাকস্বাধীনতা, জেন্ডার ও এলজিবিটিকিউ+ বিষয়ক কনটেন্ট ছেঁটে ফেলা বা সেন্সর করা হতে পারে বলে মারাত্মক উদ্বেগে রয়েছেন ভক্তরা। এর প্রতিবাদে ‘প্লেয়ার্স অ্যালায়েন্স এইচকিউ’ নামের একটি সংগঠন গেমারদের নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি আরবের শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৫১,৪০০ কোটি পাউন্ডের পিআইএফ তহবিলটি মূলত আন্তর্জাতিকভাবে দেশটির প্রভাব বিস্তার এবং ক্রীড়া ও বিনোদন খাতে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু হঠাৎ এত বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে ইএ কেনার কারণ মূলত দুটি:
১. দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি: গত বছরই ইএ ৭৫০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করেছে। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া 'ব্যাটলফিল্ড ৬' মাত্র তিন দিনে ৭০ লাখের বেশি কপি বিক্রি করে সব রেকর্ড ভেঙেছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা।
২. আন্তর্জাতিক 'সফট পাওয়ার' তৈরি: এই বিনিয়োগ শুধু অর্থের জন্য নয়, বরং বিশ্ব ক্রীড়া ও তরুণ সমাজের ওপর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অংশ। ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসেল ইউনাইটেড এবং সৌদি প্রো লিগের চার শীর্ষ ক্লাব কেনার পর, 'ইএ এফসি' গেমের স্বত্ব পাওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের প্রায় ২০,০০০ খেলোয়াড়, ৭৫০টি ক্লাব এবং ৩৫টি লিগের সাথে সরাসরি সৌদি আরবের নাম যুক্ত হয়ে গেল।
অনেক বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে 'স্পোর্টসওয়াশিং' হিসেবেও দেখছেন। কারণ বিশ্বজুড়ে জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে সৌদি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সমালোচকদের মতে, ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি এবং মানবাধিকারের বিতর্ক থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতেই সৌদির এই বিপুল বিনিয়োগ।
বিতর্ক ও শঙ্কার আবহ থাকলেও ইএ-র প্রধান নির্বাহী (সিইও) অ্যান্ড্রু উইলসন নিজের পদে বহাল থাকছেন। চুক্তির পর আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি জানান, আগামী প্রজন্মের জন্য আরও নতুন অভিজ্ঞতা তৈরিতে ইএ কাজ করে যাবে। তবে নতুন এই সৌদি মালিকানা গেমিং শিল্পে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর পুরো বিশ্বের।
তথ্যসূত্র: বিবিসি