আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
জর্ডান ও হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন বাহিনীর ওপর তেহরানের ব্যর্থ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কড়া জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে জোরালো ও ভারী হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। কিছুদিন আগে ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মার্কিন-সৌদি যৌথ অভিযানের ঠিক পরই এই নতুন ও তীব্র সংঘাতের খবর সামনে এল।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে প্রথম সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যুদ্ধটি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি কয়েক দিন হামলার বিরতি দিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের আশায় আলোচনা শুরুর গুঞ্জন শোনা গেলেও এই নতুন হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ট্রাম্প এই আলোচনাকে ‘খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করলেও তেহরান শুরু থেকেই যেকোনো আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করে আসছিল।
মার্কিন সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার মার্কিন সময় রাত আটটায় শুরু হয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই অভিযান চলে। আগের দিন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা এবং হরমুজ প্রণালীর জাহাজে ইরানের ছোড়া সবকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার পর এটিকে ‘শক্তিশালী প্রতিশোধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। এই অভিযানে মূলত ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র, উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তাদের নৌ-সক্ষমতাকে মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, আমেরিকা এবার অত্যন্ত শক্ত আঘাত হানতে যাচ্ছে; কারণ এখন তাদের পাল্টা মার দেওয়ার পালা এবং ইরান তা ভালো করেই জানে।
অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন বাহিনীর ‘আগ্রাসনের’ জবাব দিতেই জর্ডানের একটি বিমান ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছিল। এছাড়া হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ রুট ব্যবহারের এবং সতর্কতা উপেক্ষা করার অভিযোগে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারেও আঘাত হানার দাবি করেছে তেহরানের নৌবাহিনী। উল্লেখ্য, গত শুক্রবারই টানা ১৩ রাতের এক তীব্র ও ভয়াবহ মার্কিন বোমা হামলার সমাপ্তি টেনেছিলেন ট্রাম্প, যাতে ইরানের বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি বিপুল প্রাণহানির খবর পাওয়া গিয়েছিল।
এর আগে মঙ্গলবারই ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের বিভিন্ন লজিস্টিক ও অস্ত্রাগারে নজিরবিহীন যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসির নির্দেশনায় ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাবেই এই অভিযান চালানো হয় বলে জানায় সেন্টকম। ইরাকের প্রভাবশালী মিলিশিয়া জোট ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ) জানিয়েছে, ওই যৌথ হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে তাদের ‘সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত’ বলে আখ্যা দিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, বাগদাদ সরকারের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় করেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
দশক পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি পরাশক্তি সৌদি আরব এবং বৃহত্তম শিয়া রাষ্ট্র ইরানের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলে আসছিল, এই চলমান সামরিক সংঘাত ও নতুন মেরুকরণের ফলে তা এখন এক অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে।