ধ্রুব ডেস্ক
১৭ জুলাই ২০২৪, সারাদেশে নিহতদের মাগফেরাত কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে গায়েবানা জানাজা আদায় করেন আন্দোলনকারীরা। ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাইয়ের এক-একটি দিন ছিল ফ্যাস্টিস্ট সরকারের বিতাড়িত হওয়ার এক-একটি ইতিহাস। ১৬ জুলাই ঘটে নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞ। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামসহ ছয় শিক্ষার্থী।
পরদিন ১৭ জুলাই আন্দোলনকে সামাল দিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন স্বৈরাচার সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। তিনি আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
সেদিন রাজধানীসহ দেশের অন্তত আট জেলায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া অন্তত ১০টি জায়গায় সড়ক ও মহাসড়ক এবং দুই জায়গায় রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এসব ঘটনায় ৫০ জনের বেশি আহত হন। সারাদেশে সংঘর্ষ ও হামলায় নিহত ছয় শহীদের স্মরণে ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এলাকায় গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। দিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজলা ও শনিরআখড়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আট শিক্ষার্থী আহত হন। এক পর্যায়ে শনিরআখড়ার কাজলায় হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন দেওয়া হয়। ওই রাতেই সারাদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয় ফেসবুক। শিক্ষার্থীরা পরদিন সারা দেশে পরিবহন চলাচল বন্ধ রাখতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি আহ্বান করে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। পাশাপাশি অনির্দিষ্টকালের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলন, তারা হল ছাড়লেও ঢাকা ছাড়বেন না। দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের করে দেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ে (রাবি) পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাস দখলে রাখেন শিক্ষার্থীরা। ওইদিন দুপুর থেকে ক্যাম্পাস এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিকাল ৪টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। এ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ সিন্ডিকেট সদস্যদের অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ চালিয়ে যান।
যশোরে ১৭ জুলাই সকাল ১০টা থেকেই শহরের মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়কে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসে সমবেত হন।
সেখান থেকে একটি বিশাল শোক ও প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের দড়াটানা, চৌরাস্তাসহ প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে যশোর প্রেসক্লাবের সামনে এসে দীর্ঘ সময় অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা "আমার ভাই মরলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই!", "রক্তের বন্যা, ভেসে যাবে অন্যায়" ইত্যাদি স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। সমাবেশ শেষে মিছিলটি রেলগেটের দিকে অগ্রসর হয়। এদিনের মিছিলে ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
গাইবান্ধা জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। শহরের রেলগেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে রেললাইন অবরোধ করেন তারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ঘটনার পর বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বরিশালে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে ১৫ শিক্ষার্থীসহ ২২ জন আহত হন।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় ২৫ জন আহত হন। এর মধ্যে চারজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজনকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া মুন্সীগঞ্জের সুপার মার্কেট এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কমপক্ষে ১০ আন্দোলনকারী আহত হন।