❒ বুলডোজার ‘সংস্কৃতি’ ও কোরবানির আগে গরু কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গের নিউমার্কেট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া হয়। এখানকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশির ভাগ মুসলিম। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গত ৯ মে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গৃহীত বেশ কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সমগ্র রাজ্য উত্তাল হয়ে উঠেছে। একদিকে উত্তর প্রদেশের ধাঁচে শুরু হওয়া ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’, অন্যদিকে মুসলিম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার আগে রাজ্যজুড়ে গরু কেনাবেচা ও মাংসের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা—এই দুইয়ে মিলে তীব্র অস্থিরতা ও জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার মুসলমানপ্রধান তপসিয়া অঞ্চলের একটি অবৈধ চামড়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এর পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে কোনো নোটিশ ছাড়াই ওই এলাকার ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফায়ার সার্ভিসের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ছাড়া তাদের কাছে বাকি সব বৈধ কাগজপত্র ছিল। গত বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্ট এই উচ্ছেদের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করলেও বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনের কোনো নির্দেশ দেননি। ঘটনাস্থলে সিপিআইএম এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) বাসিন্দাদের পক্ষে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
একইভাবে উত্তর ভারতের কায়দায় হাওড়া, শিয়ালদহ, আসানসোল স্টেশনসংলগ্ন এলাকা এবং পার্ক সার্কাসে ব্যাপক হকার উচ্ছেদ অভিযান চলছে। এর প্রতিবাদে পার্ক সার্কাসে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ বিক্ষোভে নামলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়লে এবং পুলিশ লাঠিচার্জ করলে দুই পক্ষের অনেকেই আহত হন। বেশ কিছু আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিজেপির প্রবীণ নেতা দিলীপ ঘোষ সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, "সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। সরকারি জমি দখল কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।" অপরদিকে বসিরহাটের বিতর্কিত তৃণমূল নেতা সাদ্দাম হোসেনের অবৈধ ভবন এবং দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ায় সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের তৈরি করা ওয়াচ টাওয়ারও আদালতের নির্দেশ মেনে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
ঈদুল আজহার ঠিক আগে রাজ্য সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না এবং এর জন্য প্রাণিসম্পদ দপ্তরের লিখিত অনুমতি লাগবে। এই নির্দেশিকার পর রাজ্যজুড়ে গরু কেনাবেচা কার্যত বন্ধ এবং কলকাতার রেস্তোরাঁগুলোয় গরুর মাংস মিলছে না।
সবচেয়ে বেশি শোরগোল পড়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের লেবুখালীতে। সেখানে গবাদিপশুবাহী গাড়ি আটকে গরুর ‘জন্মসনদ’ (বার্থ সার্টিফিকেট) দাবি করেছেন স্থানীয় বিজেপির এমএলএ রেখা পাত্র। তার সাফ কথা, জন্মসনদ ছাড়া ১৪ বছরের বেশি বয়স প্রমাণ করা যাবে না, তাই গাড়ি ছাড়া হবে না।
এর জবাবে তৃণমূল কংগ্রেসের এমএলএ কুনাল ঘোষ তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, "আমরা বিধায়কের কাছে অনুরোধ করব, বিজেপিশাসিত কোনো রাজ্যের অন্তত একটি গরুর ‘জন্মসনদ’ আমাদের দেখান, তাহলে বিষয়টি আমাদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে।"
এই নিষেধাজ্ঞায় শুধু মুসলিমরাই নন, চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীরাও, যারা বছরের এই সময়ে গরু বিক্রি করে বড় অঙ্কের আয় করতেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়ে সম্প্রীতি রক্ষার্থে নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে কোরবানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তবে কলকাতার নাখুদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসেমি ১৯৫০ সালের পুরনো আইনের প্রসঙ্গ টেনে মুসলিমদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন, "আপনারা শুধু কোরবানি নয়, গরুর মাংস খাওয়াও চিরতরে বন্ধ করে দিন।"
ভোটের পর কলকাতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী রাজ্য কমিটির সভায় সিপিএমের অভ্যন্তরে ধর্মাচরণ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। এবার বিধানসভায় মাত্র একটি আসন পাওয়া দলটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মারিয়ান আলেকজান্ডার বেবি (এম এ বেবি) বলেন, "সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মাচরণের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক রয়েছে।" দলের নেতারা স্পষ্ট করেন যে, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে ধর্মকর্ম এড়ানো যাবে না এবং এখন থেকে পূজা, মন্দির, মসজিদ বা গির্জা কমিটিতে বামপন্থীদের সম্পৃক্ত হতে হবে।
এদিকে এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক রদবদলে, উত্তরবঙ্গের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন’স নেক’ (শিলিগুড়ি করিডর) অঞ্চলের সাতটি জাতীয় সড়কের দেখভালের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে রাজ্য সরকার। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এই সড়কগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রের হাতে দিতে অস্বীকৃতি জানালেও, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
বুলডোজার অভিযান ও ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর নতুন এই কড়াকড়ি পশ্চিমবঙ্গকে এক দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না—তা নিয়েই এখন সাধারণ মানুষের মনে বড় উদ্বেগ।