Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আফগানিস্তানে অভাবের সাথে যুদ্ধ

বিবিসি বিবিসি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে,২০২৬, ০২:২৮ পিএম
আফগানিস্তানে অভাবের সাথে যুদ্ধ

আফগানিস্তানের গোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানে তখন সবে মাত্র ভোরের আলো ফুটছে। বরফঢাকা সিয়াহ কোহ পাহাড়ের নিচে ধুলোমাখা এক চত্বরে জড়ো হয়েছেন শত শত মানুষ। কারও গায়ে পাতলা চাদর, কারও মুখে ক্লান্তির ছাপ। সবাই অপেক্ষা করছেন-কেউ যদি একটা কাজ দেয়। কারণ সেই কাজের ওপরই নির্ভর করছে, তাদের সন্তানরা সেদিন কিছু খেতে পাবে কি না। 

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। চরম দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার জ্বালায় অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছেন দেশটির হাজারো পরিবার। দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে না পেরে অনেক বাবা তাদের নিজের  সন্তানকে বিক্রি করার মতো অসম্ভব এবং হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। 
৪৫ বছর বয়সী জুমা খান গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। দৈনিক মজুরি হিসেবে পেয়েছেন মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মতো)। জুমা খান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার সন্তানরা টানা তিন রাত না খেয়ে ঘুমাতে গিয়েছে। ক্ষুধার জ্বালায় আমার স্ত্রী ও সন্তানরা কাঁদছিল। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ময়দা কেনার জন্য কিছু টাকা ধার চেয়েছি। আমি সবসময় এই আতঙ্কে থাকি যে আমার বাচ্চারা হয়তো না খেয়েই মারা যাবে।

আজকের আফগানিস্তানে জুমা খানের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এখন ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। বেকারত্ব, খাদ্যসংকট আর চিকিৎসাহীনতা মিলিয়ে আফগানিস্তানের বহু পরিবার টিকে থাকার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। গোর প্রদেশে সেই সংকট আরও ভয়াবহ।

চাঘচারানের শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ব্যক্তি রাবানি। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে কথা বলতে গিয়ে। 'ফোনে শুনলাম, আমার সন্তানরা দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। তখন মনে হয়েছিল আত্মহত্যা করি। পরে ভাবলাম, আমি মরে গেলে ওদের কী হবে?' পাশেই বসে থাকা বৃদ্ধ খাজা আহমদ কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানান তার বড় সন্তান আগেই মারা গিয়েছে, বাকিদের দেখাশুনা করার জন্য তিনিই কাজে নেমেছেন। কিন্তু বয়সের কারণে তাকে কেউ কাজ দিতে চায় না।

চাগচারানের পাথুরে ও বরফাবৃত পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা এক জীর্ণ ঘরে বাস করেন আব্দুল রশিদ আজিমি। তার সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তান রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত। আমি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ অসহায়। কাজ না পেয়ে যখন তৃষ্ণার্ত আর বিভ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরি, সন্তানরা এসে বলে 'বাবা, একটু রুটি দাও'। কিন্তু আমি কোথা থেকে দেব? নিজের অন্ন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য কলিজা ছিঁড়ে গেলেও এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এমনই আরেক নির্মম বাস্তবতার শিকার সাঈদ আহমদ। তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শায়িকার অ্যাপেনডিসাইটিস এবং লিভারে সিস্ট ধরা পড়ায় চিকিৎসার কোনো টাকা ছিল না। সাঈদ বলেন, মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে আমি তাকে এক আত্মীয়ের কাছে ২ লাখ আফগানিতে (প্রায় ৩,২০০ ডলার) বিক্রি করে দিয়েছি। এখন শুধু অপারেশনের টাকাটুকু নিয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে বাকি টাকা পরিশোধের পর তারা শায়িকাকে নিয়ে যাবে। যদি টাকা থাকত আমি কখনোই এই কাজ করতাম না, কিন্তু অপারেশন না করালে মেয়েটি তো মারাই যেত।

কয়েক বছর আগেও তার পরিবার খাদ্য সহায়তা পেত-আটা, তেল, ডাল, শিশুদের পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর সেই সাহায্যও বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ আফগানিস্তানে সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এ বছর পাওয়া সহায়তা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম। তার ওপর খরা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে।

 
চাঘচারানের প্রধান হাসপাতালে সংকটের আরেক রূপ দেখা যায়। নবজাতক বিভাগে প্রতিটি বেড ভর্তি। কোথাও কোথাও একই বেডে দুই শিশু রাখা হয়েছে। বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছে। অনেকে নিজেরা শ্বাসও নিতে পারছে না। 

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, দারিদ্র্যের কারণে রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। অথচ ওষুধ নেই, যন্ত্রপাতি নেই, পর্যাপ্ত বেডও নেই। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে সন্তানদের হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

চাঘচারানের সেই শ্রমবাজারের মানুষগুলো আবার ঘরে ফে্রেন-কারও হাতে সামান্য রুটি, কারও হাতে হয়তো কিছুই নেই। তবু পরদিন ভোরে তারা আবার বের হবেন, শুধু এই আশায় যে হয়তো আরেকটা দিন তাদের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)