স্কটিশ ফুটবলের শিরোপা আবারও সেল্টিকের হাতেই উঠেছে ছবি: বিবিসি
ফুটবল কখনো কখনো নিখাদ আনন্দ দেয়, আবার কখনো কখনো উপহার দেয় এমন কিছু মুহূর্ত যা বুকটা ভেঙে চুরমার করে দেয়। ফুটবল কতটা নিষ্ঠুর, কতটা হৃদয়বিদারক হতে পারে—তার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকলো স্কটিশ ফুটবলের সাম্প্রতিক ইতিহাস। পুরো মৌসুম জুড়ে মাঠ কাঁপিয়ে, সমর্থকদের মনে আশার প্রদীপ জ্বেলে, শেষ মুহূর্তে এসে এমন এক ট্র্যাজেডির শিকার হতে হবে, তা হয়তো কেউই ভাবেননি। ‘হার্টস অব মিডলোথিয়ান’ দলের এমন বিদায় আজ স্তব্ধ করে দিয়েছে গোটা ফুটবল দুনিয়াকে।
চলতি মৌসুমে স্কটিশ শীর্ষ লিগে যারা প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে টেবিলের চূড়ায় রাজত্ব করেছে, লিগের একেবারে শেষ দিনে এসে তাদেরই কি না ট্রফিটা হাতছাড়া করতে হলো! তাও আবার ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ১১ মিনিট আগে।
হাতের মুঠো থেকে ফসকে গেল ইতিহাস
শিরোপা নিজেদের করে নিতে এই শেষ ম্যাচে হার্টসের জয়েরও কোনো প্রয়োজন ছিল না, দরকার ছিল মাত্র একটি ড্র। ম্যাচের ৪৩ মিনিটে যখন দলের তারকা ফরোয়ার্ড লরেন্স শ্যাঙ্কল্যান্ডের চমৎকার এক হেডে হার্টস এগিয়ে যায়, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রূপকথা বুঝি এবার সত্যিই বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। তবে প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে (৪৫+৪ মিনিটে) পেনাল্টি থেকে গোল শোধ করে সমতায় ফেরে প্রতিপক্ষ সেল্টিক।
দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত লড়াই ছিল সমানে সমান। ১-১ গোলের সমতা ধরে রেখে ইতিহাসের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিল হার্টস। কিন্তু কে জানত, শেষ মুহূর্তে অপেক্ষা করছে এক ভয়ংকর ঝড়! ম্যাচের ৮৭ মিনিটে দাইজেন মায়েদার গোল এবং একদম শেষ মুহূর্তে (৯০+৮ মিনিটে) কলাম ওসমন্ডের নিখুঁত নিশানা মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে হার্টসের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়। ৩-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সেল্টিক।
৬৬ বছরের অপেক্ষা এবং এক আক্ষেপের গল্প
হার্টস সর্বশেষ ঘরোয়া লিগের শিরোপা জিতেছিল ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৬৬টি বছর। আজকের ম্যাচের এই একটি মাত্র পয়েন্ট তাদের এই দীর্ঘ ও কষ্টের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারতো।
শুধু তাই নয়, এই হারের ফলে অক্ষুণ্ণ রয়ে গেল এক দীর্ঘ রেকর্ডও। ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে কিংবদন্তি ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ‘অ্যাবারদিন’ দল সর্বশেষ সেল্টিক ও রেঞ্জার্সের চিরন্তন আধিপত্য ভেঙে শিরোপা জিতেছিল। এরপর দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে এই দুই পরাশক্তি ছাড়া আর কেউ এই ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। হার্টস আজ সেই দীর্ঘ আধিপত্য ভাঙার একদম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল।
ট্রফি সেল্টিকের, মন জয় হার্টসের
শেষ পর্যন্ত সেল্টিক হয়তো ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরে আরও একবার চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় পরলো ঠিকই, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজীবন এক চরম আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবে হার্টসের এই মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।
ফুটবল আসলেই বড্ড বেশি নির্মম, বড্ড বেশি বেদনাদায়ক! ট্রফি না জিতলেও কোটি ফুটবল রোমান্টিকের মন জিতে নিয়েছে হার্টস অব মিডলোথিয়ান। এই বীরত্বগাথা ফুটবল ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে।