সিদ্দিকা লাকী
আজ খুব ইচ্ছে করছে নিজের ঢোল নিজেই পেটাব, দেখা যাক কী হয়। আসলে আমার আলোচনার বিষয় হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি।
দৃষ্টিভঙ্গি কথাটা আসলে কী বুঝি! দৃষ্টির ভঙ্গি তাই তো? শৈল্পিকভাবে বলা যায়, চোখ যা দেখে—সেটা দেখে মন যা বলে আর এ দুটির কম্বিনেশনে আমাদের বাহ্যিক যে আচরণ বা প্রকাশ সেটাই হয়তোবা। প্রকৃত উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, একটি গ্লাসের ভেতর অর্ধেক পানি রেখে যদি আপনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, এখানে কী দেখা যায়? আপনার শ্রোতা বা দর্শকেরা যদি তিনজন থাকে তাহলে তিনজনই ভিন্ন উত্তর দিবে—
১. একটি গ্লাস যাতে কিছু পানি আছে ২. এই গ্লাসের অর্ধেক পানি পান করা হয়েছে ৩. এই গ্লাসে আধা গ্লাস পানি আছে, এরকম উত্তর আসতে পারে।
আপাত দৃষ্টিতে তিনজনই সঠিক উত্তর দিয়েছেন। অভিনন্দন। এখন খোলাসা করে বলি, এই যে একই বিষয়ের উপর তিনজনের তিনরকম বলা, এটা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি।
এবার একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেনের কথা বলি। আপনাদের মনে হবে—কীসের সাথে কী, পান্তা ভাতে ঘি। অসুবিধা কোথায়, চলুন ট্রাই করি—
আমার মাইক্রোওভেনটি বেশি একটা ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু বয়স ভালোই হয়েছে বলা যায়। কীভাবে যেন এটার সামনের গ্লাসডোরে কিছু ময়লা বা পোকাজাতীয় কিছু একটা ঢুকেছে। যারা ওখানে বসবাস করছে নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছে বলেই তো আছে। আমি গিন্নি হিসেবে কিছুটা নাছোড়বান্দা গোছের। একজন চাচির কাছে দেখেছিলাম তার কাছে অনেকদিনের জিনিস খুব যতনে থাকে। আর যার কাছে ১২ বছরের অধিক একটি জিনিস অক্ষত অবস্থায় থাকে, সেটা যাইহোক না কেন, তার হাতে নাকি অনেক বরকত। আমিও সেটা লালন করার চেষ্টা করি। আমি সিদ্ধান্ত নিই, ওভেনটা ক্লিন করাব। পরিচিত একজনকে দিই সেটা ঠিক করানোর জন্য। সে দু-এক জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানায়, এটা ঠিক করতে গেলে ভেঙে যাবে। তারপর আমি একজন ইলেকট্রিশয়ানকে দিই। তার অভিজ্ঞতা থেকে সেটা সার্ভিসিং করানোর জন্য। সেও একই উছিলা দেখায়। এরপরে তৃতীয়বার আরেকজন ইলেকট্রিশয়ানকে দিয়ে আমি কিছুটা আশ্বস্ত হই। যেই কথা, সেই কাজ। ময়লাও নাই, পোকামাকড়ের ঘরবসতিও গায়েব। পুরাই নতুনের মতো। বিজ্ঞাপনের জন্য কাজে লাগিয়ে দিতে পারব। কথায় আছে, একবার না পারিলে দেখ শতবার।
আমি তিনবারের বেলায় পেরেছি। আর ওই যে তিনজনের কথা বললাম, এই তিনজনেরই উত্তরগুলো ছিল পানির গ্লাসের মতো, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির অকাট্য প্রমাণ। ধন্যবাদ জানাই সেই পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গিওয়ালা ছেলেটিকে, যে আসলেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে। লার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে, যে পারবে না সে শুধু উছিলা দেখাবে, আর যে পারবে, সে কাঠখড় পুড়িয়ে হলেও পারবে। এবার দৃষ্টিভঙ্গি শব্দটিকে ইংরেজিতে লিখি-
ATTITUDE
A+T+T+I+T+U+D+E
আমরা যদি alphabetical value ধরে যোগ করি—
1+20+20+9+20+21+4+5=100
এতে কী বোঝা যায়?
Attitude বা দৃষ্টিভঙ্গি হলো জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার বা বদলে যাওয়ার চাবিকাঠি। বিশ্বাস না হলে আপনি যেকোনো ক্ষেত্রে ট্রাই করতে পারেন। উত্তর ১০০ আসবে। মানে শুধু দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সব বদলে ফেলা বা জয় করা সম্ভব, অন্যকিছু সাপোর্টিভ তো থাকবেই। কিন্তু এই উপাদানটি লাগবেই। ব্যক্তিগত সফলতা বা জাতীয় সফলতা- সবকিছুতেই attitude matter করে।
এবার অন্য প্রসঙ্গে বলি, আমি ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলে দেখেছি, দাম্পত্য জীবন অনেকটা ইনডিপেনডেন্ট। ব্যাপারটা এরকম, দিনশেষে একজন পুরুষ বউ কী রেঁধে রেখেছে এটাই খেতে হবে, ওরা এটা মনে করে না। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে হেঁসেলের কাজটা অনায়াসে সেরে নিয়েই মেহমান নিয়ে বসে পড়ল খেতে। আর বউ হয়তো ততক্ষণে একটা ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক সিডিউলে জব করে এল। ওদের দেশে আমাদের মতো ৯-৫ টা গৎবাঁধা রুটিন জব খুব কম। ওদের ডে কেয়ার ফেসেলিটিজ ছাড়া কোনো কর্মস্থলই নেই, এমনকি ওদের বেতনও প্রতিঘন্টা বা per hour বেসিস। ওরা এমন কেন? যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, তাহলে বলব—সবই ওদের দৃষ্টিভঙ্গি।
ঢাকা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন ইনচার্জ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ চাকরিকালীন দেখেছি, আমাদের দেশের ছেলেরা এয়ারপোর্টে ঢুকেই বউয়ের কোলের বাচ্চাটিকে পেটের সামনে বিশেষ ব্যাগ দিয়ে বুকে জড়িয়ে নেয়। দেখেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কারণ বউয়ের কষ্টটা স্বামী শেয়ার করছে, এতে কোনো ভেজাল নেই। কিন্তু দেশের ভেতরে, যতটুকু জানি ৫০%-এরও বেশি মেয়েরা কর্মস্থল বা পরিবারে সেই শেয়ারিং সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ একটাই—ছোটোবেলা থেকে মা তাকে ডিমের কুসুমটা, মাছের মাথাটা আরও কত কী, সেরাটা খাইয়ে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় করে তুলেছে। মীনা কার্টুন দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর বিষয়গুলো নিয়ে অনেক কাজ করেছে।
এবার বলি, নির্যাতন বা ক্ষমতায়ন বিষয়টি নিয়ে। এখানেও ওই একই সমস্যা। কাকতালীয়ভাবে শব্দ দুটিই জেন্ডার সেনসিটিভ। ধরেই নেওয়া হয়, নির্যাতন মানেই নারী নির্যাতন আর ক্ষমতায়ন মানে নারীর ক্ষমতায়ন। কেন রে ভাই (বোন), পুরুষের কী ক্ষমতায়ন দরকার নেই? পুরুষরা কী নির্যাতিত হয় না? আমরা এভাবে ভাবছি না কেন? মানুষের (যার জন্য প্রযোজ্য) ক্ষমতায়ন, মানুষের (যার জন্য প্রযোজ্য) নির্যাতন, সেটা তো আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যে কেউই হতে পারে! ধারণাগত ভুল নিয়ে উন্নয়নের দিকে এগোলে খুব বেশি সুফল পাওয়া যায় না। নারী নির্যাতন নিয়ে দু-একটি কথা বলে এ পর্ব শেষ করব।
আরও পড়ুন-
বলা হয়, এদেশে নারীরা নারীদের দ্বারাও নির্যাতিত হয়ে থাকে। আমি বলি, এক্ষেত্রে শাশুড়ি ননদ দা-কুমড়ো সতীন সম্পর্কগুলো উদাহরণ টানা যায়। কিন্তু নরমে গরমে যদি বোঝার চেষ্টা করি, অধিকার আর দায়িত্ববোধ নাকি বিনিসুতোয় গাঁথা। মানে আপনার স্বামীর তো বিবাহ করার মতো অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি, তাকে কোনো না কোনো মা জন্ম দিয়েছে, কোনো না কোনো বোন তাকে লুটোপুটি খেলে সঙ্গ দিয়েছে। আর আপনি, যেন এলেন, দেখলেন, জয় করলেন, বাহ!
মানুষ তার অতীত, বর্তমান আর অজানা নিয়েই বাঁচে। আপনি তার চলার পথে মধ্য পথযাত্রী মাত্র। এ কথাগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। এবার নিজের ঢোল পিটিয়ে শেষ করি। আমি ব্যক্তিগত জীবনে এগুলো চর্চা করি বলেই সম্পর্কের অবনতি ঘটার মতো ঘটনা আমার দ্বারা ঘটেনি বা আমার ক্ষেত্রেও ঘটেনি।
লেখক : কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।