আনিকা চৌধুরী
ছবি: এআই
কোনো এক শুনশান রাত। সিলিং ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে। বাইরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল। কোন এক ঘরে গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠল কেউ। ঠিক জেগেও না। আধো ঘুম, আধো জাগা। চোখগুলো খোলা ঠিকই, কিন্তু আশপাশের সবকিছুতে তন্দ্রাচ্ছন্নের মো মনে হচ্ছে। যখনই নড়াচড়া করার চেষ্টা করছে তখনই ঘটল বিপত্তি। হাত পা সব অসাড় হয়ে আছে। গলা দিয়ে শব্দ বের হওয়ার আগেই তা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তখনই হঠাৎ মনে হয় বুকের ওপর যেন কেউ বসে আছে। শ্বাস নেয়া যায় না। এমনটা কি কখনো আপনার সাথে হয়েছে? আমাদের দেশে এর একটি বহুল প্রচলিত নাম আছে— ‘বোবা ধরা’।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা আসার বহু আগে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই এই বোবা ধরার নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল। কেউ কেউ বলতেন এটা এক ধরনের অশরীরী। বাংলাদেশের কোনো কোনো গ্রামে এখনো বিশ্বাস করা হয়, অশুভ কিছু এসে বুকের ওপর বসে।
শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়। জাপানে এ ‘বোবা ধরা’কে বলা হয় ‘কানাশিবারি’। সেখানকার অনেকেই এ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, অদৃশ্য কোন শক্তি শরীরকে লোহার শিকলে বেঁধে ফেলেছে। ইউরোপের পুরোনো লোককথায় এটি ছিল ‘নাইট হ্যাগ’ নামে। এক ছায়াময় সত্তা, যে ঘুমন্ত মানুষের বুকের ওপর চেপে বসে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অলৌকিক সব গল্প; জিন, আত্মা, অজানা শক্তি—এগুলো কেবল গল্প নয়। দৈনন্দিন বিশ্বাসের অংশ। ধর্ম, লোককথা, পারিবারিক স্মৃতি—সব মিলিয়ে এগুলো গভীরভাবে গেঁথে আছে মানুষের কল্পনায়। তাই যখন আধা-স্বপ্নের অবস্থায় মস্তিষ্ক একটি ‘উপস্থিতি’ তৈরি করে, তাকে মানুষ এসব লোককথার অংশ হিসেবেই কল্পনা করে।
এই গল্পগুলো পুরোপুরি ভুল নয়, আবার পুরোপুরি ঠিকও নয়। আধুনিক বিজ্ঞান এমন অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেনি। বরং এর উত্তর খুঁজেছে মানুষের নিজের মস্তিষ্কের ভেতরেই। ঘুমের একটি পর্যায় আছে, আরইএম (র্যাপিড আই মুভমেন্ট)। ওই সময়ে মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা, আবেগ-সব তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সঙ্গে শরীরকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবশ হয়ে থাকে, যাতে আমরা স্বপ্নের ভেতরের কাজগুলো বাস্তবে করে না ফেলি। প্রায় প্রতিদিনই এই প্রক্রিয়া মানবদেহে নিখুঁতভাবে কাজ করে। কিন্তু কখনো কখনো সিস্টেম চিরায়ত প্রথার বাইরে চলে যায়। তখন মস্তিষ্ক জেগে ওঠে, কিন্তু শরীর থাকে গভীর ঘূমে। সেই মুহূর্তে মানুষ দুই জগতের মাঝে আটকে পড়ে। একদিকে বাস্তবতা— বিছানা, দেয়াল, চারপাশ। অন্যদিকে স্বপ্ন: তীব্র, আবেগপূর্ণ, অ্যাবসার্ড।
দক্ষিণ এশিয়ায় অলৌকিক সব গল্প; জিন, আত্মা, অজানা শক্তি—এগুলো কেবল গল্প নয়। দৈনন্দিন বিশ্বাসের অংশ। ধর্ম, লোককথা, পারিবারিক স্মৃতি—সব মিলিয়ে এগুলো গভীরভাবে গেঁথে আছে মানুষের কল্পনায়। তাই যখন আধা-স্বপ্নের অবস্থায় মস্তিষ্ক একটি ‘উপস্থিতি’ তৈরি করে, তাকে মানুষ এসব লোককথার অংশ হিসেবেই কল্পনা করে।
বিজ্ঞান আরো নির্ভুলভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছে। ঘুমের ‘আরইএম’ পর্যায়ে শ্বাস হয় হালকা ও নিয়ন্ত্রিত। হঠাৎ জেগে উঠলে এই অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসকে মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভয়ের তীব্রতায় থাকা মস্তিষ্ক এটাকে বাহ্যিক চাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। আদতে কোন অশরীরী বুকের ওপর চেপে বসে না।
বেশিরভাগ মানুষের জন্য ঘুম-প্যারালাইসিস বিপজ্জনক নয়। এটি ক্ষণস্থায়ী, কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট থাকে। যদিও সেই সময়টা অনেক দীর্ঘ মনে হয়। কখনো এটি অনিয়মিত ঘুম বা নারকোলেপসির কারণে হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি হঠাৎ আসে, আবার হারিয়েও যায়।
বাহ্যিক শক্তির ব্যাখ্যায় স্লিপিং প্যারালাইসিস বা বোবা ধরা একটি মিথ। কিন্তু এর শিকড় গাঁথা আছে একেবারে বাস্তব, মানবিক অভিজ্ঞতায়, যাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বাসের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সূত্র : বনিকবার্তা