❒ বেগম খালেদা জিয়া স্বাক্ষরিত নীতিগত সিদ্ধান্ত
মো. আবুবকর সিদ্দিক
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে একটি সুদৃঢ় কাঠামোতে আনার লক্ষ্যে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার পদের কম্পোজিশন পুনর্বিন্যাস করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায় সংক্রান্ত ৩১৮টি পদ অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন ও অবৈতনিক। এ লক্ষ্যে ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাথমিক শিক্ষাকে আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের প্রজ্ঞাপনমূলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ’ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত সব দায়-দায়িত্ব এই বিভাগকে অর্পণ করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব ও কাজের পরিধি অনুধাবন করে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ.এস.এইচ.কে সাদেক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের সচিব ড. সাদত হোসাইন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় গঠন এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ের ক্যাডার পদগুলো পৃথকীকরণের জন্য তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেন।
পরবর্তীকালে ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও মন্ত্রণালয়ের জন্য পেশাভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তথা ‘বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার’ আজও গঠন করা হয়নি। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্যাডারভুক্ত পদগুলো বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের আওতাভুক্তই রয়ে গেছে।
জাতীয় শিক্ষা কমিশন-২০০৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর যখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল, তখন প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কিছু পদকে ক্যাডার পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এগুলো সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের পদ হিসেবে চিহ্নিত। প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নতুন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যাওয়ার পর এই পদগুলো শিক্ষা ক্যাডারে থাকার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।
পরবর্তীকালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ে সাধারণ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প, এস্টিম প্রকল্প, আইডিএ প্রকল্প এবং পিইডিপি-২ ও ৩-এর আওতায় সৃষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক, উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক, শিক্ষা অফিসার, গবেষণা অফিসার ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)-এর সমতুল্য ২২৮টি পদ রাজস্ব খাতে আত্তীকরণ করা হয়।
২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে পিইডিপি-২-এর কার্যক্রম শুরু হয়। পিইডিপি-২-এর প্রোগ্রাম ডকুমেন্টে ‘অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’-এর আওতায় বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ক্যাডার থেকে প্রাথমিক শিক্ষার অংশ পৃথক করে বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের সারসংক্ষেপ প্রেরণ করা হয়েছিল।
প্রেরিত সারসংক্ষেপে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার পদসহ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থেকে শুরু করে সব প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা (সিস্টেম অ্যানালিস্ট, প্রোগ্রামার, প্রকিউরমেন্ট ও সাপ্লাই অফিসার, উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার, পিটিআই ইন্সট্রাক্টর, ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর এবং স্টোর কর্মকর্তা) নিয়ে বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের প্রস্তাব করা হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১২ জুন ২০০৬ সালে এতে নীতিগত সম্মতি প্রদান করে স্বাক্ষর করেছিলেন। এরপর প্রায় ২০ বছর অতিবাহিত হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের যৌক্তিকতা
১) ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এক লাখ ৫৬ হাজার ৭২৪ জন শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করা হয় এবং ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে আরও ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এক লাখ পাঁচ হাজার ৬১৬ জন শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে চার লাখ ৭৭ হাজার ১২৫ জনের অধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন, যা বাংলাদেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তিন ভাগের দুই ভাগের জন্য ২৬টি বিসিএস ক্যাডার থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কোনো বিসিএস ক্যাডার নেই। প্রাথমিক শিক্ষার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠন করা প্রয়োজন।
২) প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত টাস্কফোর্স প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি পৃথক ক্যাডার সৃজনের সুপারিশ করে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত জাতীয় পরিকল্পনাতেও বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের সুপারিশ রয়েছে। জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-২০০৩-এ বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের সুপারিশ রয়েছে। তা ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-২ বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঋণ চুক্তিতে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
৩) বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার গঠন এই সেক্টরে কর্মরত জনবলকে অধিকতর গতিশীলতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা ও নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। উচ্চশিক্ষিত, সুপ্রশিক্ষিত, প্রণোদিত, অঙ্গীকারাবদ্ধ ও নিজস্ব ক্যাডার কর্মকর্তা প্রাথমিক শিক্ষার টেকসই উন্নয়নের জন্য একান্ত প্রয়োজন।
৪) বাংলাদেশে ২৬টি বিসিএস ক্যাডারের মধ্যে বেশ কয়েকটি ক্যাডারের সদস্য সংখ্যা মাত্র ১০০-২০০ জন। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রথম শ্রেণির ২৫৪১টি পদ থাকা সত্ত্বেও পৃথক কোনো ক্যাডার নেই। অন্যান্য ক্যাডারের মতো প্রাথমিক শিক্ষায় সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা, দক্ষতা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার না থাকার নেতিবাচক দিকগুলো
১) প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত অধিকাংশ কর্মকর্তা বদলি ও প্রেষণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে কর্মরত থাকায় তারা তাদের নিজস্ব ক্যাডারের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও অর্জিত অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রয়োগ করার পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। অধিকন্তু, প্রেষণে নিয়োজিত এসব কর্মকর্তাকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার পর প্রাথমিক শিক্ষাবহির্ভূত অন্য দপ্তরে পদায়নের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার কোনো সুফল পাওয়া যায় না।
২) বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত ক্যাডারের সদস্য না হওয়ায় তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার গাইডলাইন নেই। তাদের অধিকাংশই যে পদে চাকরি শুরু করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই পদ থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।
৩) দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় চার লাখ ৭৭ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত। এর মধ্যে ২৫৪১ জন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা। দেখা যায়, বাকি ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ২৬টি ক্যাডার বিদ্যমান থাকলেও প্রায় পাঁচ লাখ জনবলের বিশাল এই সেক্টরে স্বতন্ত্র কোনো ক্যাডার নেই।
প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল কর্মপরিধি ও জনবলের বিস্তৃতি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় অনেক বেশি। পৃথকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠিত হলে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিভাবান কর্মকর্তারা এই সেক্টরে যোগদানে উৎসাহিত হবেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিশেষে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করি, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বাক্ষরিত নীতিগত সিদ্ধান্ত—অর্থাৎ ‘বিসিএস (প্রাথমিক শিক্ষা) ক্যাডার’ অতিসত্বর বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের পথ সুগম করবেন।
লেখক: ইন্সট্রাক্টর (সাধারণ), ১ম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা, পিটিআই, বাগেরহাট।
*মতামত লেখকের নিজস্ব