লেখা: ফিলিপ বোলোপিয়ন, অনুবাদ: মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
কয়েক দশক ধরে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী নেতারা সাধারণত অজ্ঞতার অজুহাত দিতেন অথবা দাবি করতেন যে এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল এবং তাঁদের হাত পরিষ্কার। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যা বদলে গেছে তা হলো—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত এক উদ্ধত অবজ্ঞা। তারা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকারী আন্তর্জাতিক আইনগুলোকে কেবল অগ্রাহ্যই করছে না, বরং উপহাস করছে এবং প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি অবিলম্বে এই নিয়মগুলোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত না করে, তবে তারা হয়তো এই ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধ্বংসকেই নীরবে মেনে নিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে বলেছেন যে, তাঁর "আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই" এবং তাঁর ক্ষমতার একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো তাঁর "নিজস্ব নৈতিকতা"। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ "সর্বোচ্চ প্রাণঘাতীতা" নিশ্চিত করার স্বার্থে "দুর্বল আইনগত বৈধতাকে" (tepid legality) সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি তাঁরা প্রকাশ্যে সামান্যই ভ্রুক্ষেপ করছেন; অথচ এই যুদ্ধটি সবে দ্বিতীয় মাসে পা রেখেছে। ইরানের খার্গ দ্বীপ ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, "শুধু মজার ছলে আমরা হয়তো আরও কয়েকবার আঘাত হানতে পারি।" হেগসেথ ঘোষণা করেছেন যে, ইরানে শত্রুদের "কোনো ক্ষমা" (no quarter) করা হবে না—আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষায় এই শব্দবন্ধের অর্থ হলো, আত্মসমর্পণকারীদের বন্দি করার পরিবর্তে সৈন্যরা তাদের সরাসরি হত্যা করতে স্বাধীন। অথচ মার্কিন সামরিক একাডেমিগুলোতে এই ধরনের পরিস্থিতিকে যুদ্ধাপরাধের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হয়।
এই মানসিকতায় ট্রাম্প প্রশাসন একা নয়। গাজা যুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দক্ষিণ লেবানন জুড়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং লক্ষ লক্ষ বেসামরিক নাগরিকের প্রত্যাবর্তন চিরতরে ঠেকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। একইভাবে, ইরানের 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর' (আইআরজিসি) মার্কিন ব্যাংক, বিনিয়োগ সংস্থা এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে—বেসামরিক হওয়া সত্ত্বেও—বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছে। আইআরজিসি মুখপাত্র ইরানিদের সতর্ক করে বলেছেন যে, রাজপথে যেকোনো বিক্ষোভের জবাব জানুয়ারির গণহত্যার চেয়েও "আরও কঠোর আঘাতের" মাধ্যমে দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন উপস্থাপক আরও সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, প্রবাসে থাকা বিরোধীদের এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে যে তাদের "মায়েদের আজীবন শোক পালন করতে হবে"।
এই বিবৃতিগুলো আমাদের গভীর মনোযোগ দাবি করে। কেবল বেসামরিক জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার কারণে নয়, বরং এই কারণেও যে—এই নেতারা যা বলছেন, তা তাঁরা আন্তরিকভাবেই করতে চাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইরানে ২,০০০ জনেরও বেশি, লেবাননে ১,২০০ জনেরও বেশি এবং ইসরায়েলে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চল, ইসরায়েল ও লেবানন জুড়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী ছিল, যেখানে ১৭০ জনেরও বেশি শিশু ও শিক্ষক-কর্মী নিহত হন।
জনবহুল এলাকায় ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের বসতবাড়িতে 'সাদা ফসফরাস' নিক্ষেপ করছে, যা মানুষের হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম। অন্যদিকে, ইরান ইসরায়েলি শহরগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ 'ক্লাস্টার' (গুচ্ছ) বোমা নিক্ষেপ করেছে এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থাটি রাতারাতি ভেঙে পড়েনি। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ, হাসপাতাল ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং আড়াই বছর ধরে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সমর্থন এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে যে—কিছু নেতা সবসময়ই আইনের ঊর্ধ্বে।
এই 'দ্বৈত নীতি' এখনও বহাল আছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। যখন ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাল, তখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে নিন্দা জানানো হয়েছিল। কিন্তু যখন ইসরায়েল বেআইনিভাবে লেবাননের আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাস নিক্ষেপ করল, তখন সেই একই সরকারগুলো নীরব হয়ে গেল। বিশ্ব নেতাদের সমান জোরের সাথে বলতে হবে যে—হামলাকারী যেই হোক না কেন, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, লেবাননের বাড়িঘর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলা যুদ্ধ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অন্যথায়, এই নিয়মগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার একটি লাঠিতে পরিণত হবে।
জেনেভা কনভেনশন প্রতিটি দেশকে কেবল যুদ্ধের আইন মেনে চলতেই বাধ্য করে না, বরং সেগুলোর প্রতি বৈশ্বিক সম্মান নিশ্চিত করতেও দায়বদ্ধ করে। এর মধ্যে রয়েছে—যুদ্ধাপরাধের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো বাহিনীর কাছে অস্ত্র সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানানো।
দুর্ভাগ্যবশত, এই সংঘাতের প্রতিটি পক্ষেই অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে এবং এর পরিণাম সম্পর্কে দৃশ্যত কোনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে না। যে ইউরোপীয় সরকারগুলো বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা বর্ষণকারী বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে বা তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তারা কেবল দর্শক নয়। যদি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর কার্যক্রম তাদের নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আস্ফালনের সাথে মিলে যায়, তবে অস্ত্র বা সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোও খুব সম্ভবত যুদ্ধাপরাধে সহযোগী হিসেবে গণ্য হবে।
প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধ বা অতি সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধের মতো, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াটি সংঘাত চলাকালীনই শুরু করা প্রয়োজন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধরত পক্ষগুলো ঠিক সেটাই প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। ইরান দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে; ইসরায়েল সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে এবং সাংবাদিকদের আটক করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও, ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (FCC) ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিকূলে সংবাদ প্রচারের জন্য সম্প্রচারকারীদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়েছে।
উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর উচিত এখনই যুদ্ধাপরাধের প্রমাণগুলো—যেমন স্যাটেলাইট চিত্র, রেকর্ড করা যোগাযোগ বা ওপেন-সোর্স ফুটেজ—সংরক্ষণ ও ভাগ করে নেওয়া। জাতিসংঘের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অবিলম্বে অতিরিক্ত সম্পদের প্রয়োজন। এবং প্রতিটি সরকারকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে সোচ্চার হতে হবে।
যদি এই কাজগুলো গোলাগুলি থামার অপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়, তবে প্রমাণ লোপ পেতে পারে এবং জবাবদিহিতার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দ্রুত স্তিমিত হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধরত পক্ষগুলো তা জানে এবং সম্ভবত তারা সেই সুযোগেরই অপেক্ষায় আছে।
আজ যারা যুদ্ধের আইন অগ্রাহ্য করছেন, সেই নেতারা হয়তো ভাবছেন যে—নিয়মহীন একটি বিশ্ব তাদের লাভবান করবে, যেখানে পাশবিক শক্তিই চূড়ান্ত সত্য এবং বেসামরিক প্রাণহানি কেবল 'আনুষঙ্গিক ক্ষতি' (collateral damage)। কিন্তু তারা 'অ-পারস্পরিকতার নীতি' (principle of nonreciprocity) অগ্রাহ্য করে—যা স্পষ্ট করে দেয় যে এক পক্ষের আইন লঙ্ঘন অন্য পক্ষের অমান্য করাকে বৈধতা দেয় না—এমন এক পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন, যা তাদের নিজেদের সৈন্য এবং বেসামরিক জনগণকে চরম বিপদে ফেলেছে।
যারা যুদ্ধের বর্বরতা দমনে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝেন, তাদের এখনই এর পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো উচিত। নইলে, একদিন হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের এই কৈফিয়ত দিতে হবে যে—সবকিছু যখন পুড়ছিল, তখন আমরা কেন কিছুই করিনি।
ফিলিপ বোলোপিয়ন: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক। এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।