Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

চক্রাকার বা পুনর্জন্ম অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ: কিয়াম মেটাল

ড. এস এম তাজউদ্দিন ড. এস এম তাজউদ্দিন
প্রকাশ : রবিবার, ৫ এপ্রিল,২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
আপডেট : রবিবার, ৫ এপ্রিল,২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
চক্রাকার বা পুনর্জন্ম অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ: কিয়াম মেটাল

সার্কুলার ইকোনমি (Circular Economy) হচ্ছে একটি টেকসই বৃত্তাকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা বর্জ্য ও দূষণ রোধ করতে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত হয়েছে। এটা এমন একটি ব্যবস্থা যা একটি শিল্পের বর্জ্য অন্য শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশ সুরক্ষা হয়, অন্য দিকে সম্পদের অপচয় রোধ হয়, ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত শিল্পায়ন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্জ্যের পাহাড় জমে পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ক্রমশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ছে। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় Circular Economy ' অর্থাৎ পুনজন্ম অর্থনীতি' বা 'পুনঃউৎপাদন ও পুনর্ব্যবহার' অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধরলা শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বর্জ্যকে একটি মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরিত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সাধারণত, বর্জ্যকে একটি মূল্যহীন পদার্থ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু চক্রাকার অর্থনীতিতে, বর্জ্যকে নতুন পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বর্জ্যকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা। এই দর্শনটি তিনটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত:

১. এমনভাবে পণ্য ডিজাইন করা যেন তা বর্জ্য ও দূষণমুক্ত হয়।

২. পণ্য ও কাঁচামালকে বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের জীবনকাল বাড়ানো।

৩. প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই পদ্ধতি রৈখিক অর্থনীতির একমুখী প্রবাহকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

কিয়াম মেটাল কুষ্টিয়া অব্যবহৃত বৈদ্যুতিক অ্যালমুনিয়াম (তারকে) বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে সম্পদে রূপান্তরিত করে। বৈদ্যুতিক অ্যালমুনিয়াম তারকে উচ্চ তাপমাত্রায় গলিয়ে রোলসিট তৈরি করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নানারকম কিচেন সামগ্রী তৈরি করে। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমে, মুনাফা বৃদ্ধি পায়, এবং নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়। সব মিলিয়ে, চক্রাকার অর্থনীতি ধারনাটি বব্যবহার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহায়তা করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অনন্য অবদান রাখছে।

কিয়াম মেটাল কুষ্টিয়ার ন্যায়, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নতুন প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা, পুরোনো ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা, বা জৈব বর্জ্য থেকে জৈব সার এবং বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। একইভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে সীসা, লিথিয়াম এবং নিকেলের মতো মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা যায়। এগুলো নতুন ব্যাটারি তৈরি, সোলার এনার্জি স্টোরেজ বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের উৎপাদনে ব্যবহার করে শুধু পরিবেশ দূষণই কমানো নয়, বরং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যায়। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমানো যায়, এবং বর্জ্য নিষ্পত্তির খরচও হ্রাস করা যায়।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এর পাশাপাশি বাড়ছে শহুরে বর্জ্যের পরিমাণ। এই বর্জ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, এবং রিসাইক্লিং শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ছোট থেকে বড়, সব ধরনের উদ্যোগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ সম্ভব।

চক্রাকার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

চক্রাকার অর্থনীতির পথে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন- বর্জ্য পৃথকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব, এবং এই খাতে বিনিয়োগের স্বল্পতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিং শিল্পকে উৎসাহিত করতে সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা। জনগণের মধ্যে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং রিসাইক্লিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম পরিচলনা করা। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে।

প্রস্তাবনা

দায়িত্বশীল উৎপাদন:  চক্রাকার অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বাধিক মুনাফার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি, অবশ্যই পণ্যগুলিকে আরও টেকসই করার জন্য ডিজাইন করা, যা সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হবে এবং প্রকৃতির কোনপ্রকার ক্ষতিসাধন করবে না। একটি চক্রাকার অর্থনীতি অর্জনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিকল্পনা এবং নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

নতুন পণ্যের ব্যবহার কমানো: নতুন পণ্যের ব্যবহার কমানো বলতে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারে সচেতন বোঝানো হয়েছে। আরও দায়িত্বশীলভাবে পণ্য ক্রয়ের দিকে মনোনিবেশ করা । কোন পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, নিশ্চিত হতে হবে যে, এটি সত্যিই কতটা প্রয়োজন ।

মূলকথা- ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ লোয়ার স্ট্রিমে অবস্থিত। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশকে বন্যা, খরা, সুনামি, নদী ভাঙনসহ নানান দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। তার ওপর প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার তো আছেই, যা কিনা ব্লু ইকোনমিকেও হুমকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭৯ শতাংশ বর্জ্য পরিবেশের সঙ্গে মিশে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। এমনকি প্লাস্টিকজাত পণ্য পরিবেশের সঙ্গে মিশে আমাদের ফুড চেইনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দৈনন্দিন খাবারের অংশীদার হয়ে যায়, যা জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া বর্তমান সময়ে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী এসব বর্জ্য রিসাইকেলের উদ্যোগ নিলে পরিবেশের জন্য যেমন উপকারী হতে পারে, তেমনি আর্থিকভাবে লাভবানেরও দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই একে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে একটি ‘সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে। তবে এর জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে প্রশিক্ষণ বা উৎসাহ প্রদান, সুফল সম্পর্কে আলোকপাত, যত্রতত্র বর্জ্য নিক্ষেপে জরিমানা, আইন প্রয়োগ ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া গেলে একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।

(লেখার ভেতরে ব্যবহৃত ছবিগুলোতে লেখকসহ একদল গবেষককে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বর্জ্য'র চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে)

*মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক: গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক (ব্যবসায় প্রশাসন), ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, যশোর।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)