তহীদ মনি
যশোর জেলা পরিষদ ভবন ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর জেলার সবচেয়ে ধনী বা সম্পদশালী সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনটি? একবাক্যে উত্তর আসবে—যশোর জেলা পরিষদ। অথচ অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই জেলা পরিষদের নিজের ঠিক কত টাকার বা কতটুকু সম্পদ আছে, তার কোনো সঠিক হিসেব খোদ অফিসের নথিপত্রেই নেই। জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি টাকার জমি, পুকুর আর দোকান এখন প্রভাবশালীদের দখলে।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন প্রশাসক ও বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন খোকন। তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—যশোর জেলা পরিষদের হারিয়ে যাওয়া এই বিশাল সম্পদের পাহাড় খুঁজে বের করা এবং সেগুলোকে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করা।
যশোর জেলা পরিষদের আয়তন ও সম্পদের পরিমাণ দেশের অন্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি। নথিপত্র অনুযায়ী, জেলা জুড়ে পরিষদের প্রায় ৩০০ একর জমি রয়েছে। কিন্তু চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এই জমির প্রায় ৭০ শতাংশই এখন পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কোথাও কোথাও ভুয়া কাগজ তৈরি করে জমি কেনাবেচা হয়ে গেছে, আবার কোথাও বছরের পর বছর প্রভাবশালীরা দখল করে বসে আছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্র চিত্রা মোড়ের পাশে অত্যন্ত মূল্যবান ৮৮ শতক জমি অন্য একটি সরকারি দপ্তর দখল করে রেখেছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই জমি উদ্ধার করে কোনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। শুধু জমি নয়, জেলা পরিষদের কতগুলো পুকুর আছে, রাস্তার ধারে কত হাজার গাছ আছে কিংবা মোট কতগুলো দোকান ঘর থেকে মাসে কত টাকা ভাড়া আসার কথা—তার কোনো আধুনিক বা ডিজিটাল পরিসংখ্যান নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।
বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, জেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রতিষ্ঠানটি চালিয়েছেন। হাজার হাজার গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা বা প্রভাবশালীদের নামে দোকান ও জমি লিজ দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি লিজ দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরে মাত্র কয়েক হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
নতুন প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই জট খোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, জেলা পরিষদের প্রতিটি ইঞ্চি জমি চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। যেখানেই অবৈধ দখল পাওয়া যাবে, সেখানেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা আমানত এবং বিভিন্ন লিজের নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যশোর জেলা পরিষদের যে পরিমাণ সম্পদ ও ব্যাংক আমানত (বর্তমানে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা) রয়েছে, তা যদি সঠিকভাবে ও স্বচ্ছতার সাথে ব্যবহার করা যেত, তবে যশোরবাসীর উন্নয়নের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না। এই টাকা দিয়ে জেলার শত শত মেধাবী ছাত্রছাত্রীর উপবৃত্তি, গরিব মানুষের চিকিৎসা, রাস্তাঘাট মেরামত এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু সম্পদগুলো প্রভাবশালীদের কবলে থাকায় সাধারণ মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা পরিষদের টাকা মূলত যশোরের সাধারণ মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, রাস্তাঘাট মেরামত, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শ্মশানসহ সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে জেলা পরিষদের নিজস্ব তহবিল (রাজস্ব খাত) থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন ভবন উন্নয়ন, পুকুর খনন, সৌন্দর্য বর্ধন এমনকি ডিসি বাংলোর বাগানের কাজেও। অথচ এসব কাজ গণপূর্ত বিভাগ বা বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে হওয়ার কথা।
এর ফলে গত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি তহবিল থেকে ৪ কোটি টাকার কাজ হয়েছে, সেখানে রাজস্ব খাতের নিজস্ব অর্থের কোনো প্রকল্পই সাধারণ মানুষের উপকারে আসেনি।
বর্তমান প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, যশোর জেলা পরিষদের সম্পদ নিয়ে যে নয়-ছয় হয়েছে, তা ভয়াবহ। আমরা প্রতিটি সম্পদের তালিকা তৈরি করছি। দোকান বা জমি বরাদ্দে কোনো জালিয়াতি থাকলে তা বাতিল করা হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই—জনগণের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং জেলা পরিষদকে একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
যশোরের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে, নতুন এই নেতৃত্বের হাত ধরে কোটি কোটি টাকার এই সরকারি সম্পদ উদ্ধার হয় কি না। কারণ এই সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হলেই কেবল জেলা পরিষদের প্রকৃত সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।