নজরুল ইসলাম
ছবি: এআই প্রণীত
গ্রামের বাড়ি থেকে বারবার ফোন আসছিল তাওসিফের কাছে। পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বাবা বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন, ‘একবার অন্তত দেখে আয়।’ বেসরকারি চাকরিজীবী তাওসিফ বাবার কথা ফেলতে পারেননি। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালের মোড় পর্যন্ত। কিন্তু ফলের দোকানে গিয়ে বিভিন্ন ফলের দাম শুনে পকেটের হিসাবের সাথে মেলাতে না পেরে থমকে দাঁড়ান। দাম বেশি থাকায় তিনি সেদিন আর ফল কিনতে পারেননি।
বাবার চাপে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই হাসপাতালে যান তাওসিফ। বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ মানুষটির কাছে গিয়ে গতানুগতিক খোঁজখবর নেন—কী খাচ্ছেন, কেমন আছেন। এরপর ‘পরে আবার আসব’ বলে দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে চলে আসেন। এরপর তিনি আর সেখানে যাননি; কারণ খালি হাতে আবার হাসপাতালে যাওয়ার মতো সাহস বা আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
তাওসিফ একা নন। বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের অনেকেরই আজ হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়ার সেই পুরনো সামাজিক সংস্কৃতি বজায় রাখার সামর্থ্য ফুরিয়ে আসছে। একদিকে জীবন বাঁচাতে ওষুধের আকাশচুম্বী খরচ জোগাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন রোগীর স্বজনরা, অন্যদিকে পথ্য হিসেবে পরিচিত আপেল, আঙুর, বেদানা ও ডাবের দাম যেভাবে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, তাতে শুভানুধ্যায়ীদের পক্ষেও ফল কিনে রোগী দেখতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
যশোরের বাজারে ৪০০ টাকার নিচে মিলছে না বিদেশি ফল
যশোরের ফলের পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে এক বাস্তব চিত্র। ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে প্রায় সব ধরনের বিদেশি ফলের দাম। ছোট আকারের কাশ্মীরি আপেল বা সামান্য কমদামি ফল ছাড়া বাজারে এখন ৪০০ টাকার নিচে কোনো বিদেশি ফল মিলছে না বললেই চলে। বড় আকারের আপেল, বেদানা, আঙুর, কমলা ও মাল্টা—সব ফলই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের বর্তমান দর
আপেল: প্রতি কেজি চায়না ও গালা আপেল বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। তবে ছোট আকারের কাশ্মীরি আপেল কিছুটা কমে ৩০০-৩৫০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। কমলালেবু: আকারভেদে প্রতি কেজি কমলা বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। বেদানা: বাজারে সর্বোচ্চ দামে বিক্রীত ফলগুলোর মধ্যে বেদানা অন্যতম, যার প্রতি কেজির দাম ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা। মাল্টা ও আঙুর: এই ফলগুলোও বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে।খেজুর: সবচেয়ে কম দামি বস্তা খেজুর ২৫০-৩০০ টাকা কেজি হলেও ভালো মানের দাবাস খেজুর ৬০০-৮০০ টাকা এবং প্রিমিয়াম মরিয়ম খেজুর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের এই অস্থিরতার পেছনের কারণ
ফলের বাজারের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির পেছনে ব্যবসায়ীরা উচ্চ হারের আমদানি শুল্ককে দায়ী করছেন। পাশাপাশি পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমস হয়রানি, ডলারের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকেও দায়ী করছেন তারা। এর বাইরে কিছু ব্যবসায়ী আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটকেও বাজার অস্থিরতার জন্য দায়ী করেছেন।
যশোর ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম লিটন এই বিষয়ে বলেন, “পুষ্টির চাহিদা মেটানোর অন্যতম প্রধান উপকরণ ফল। অথচ সরকারের ট্যাক্সের তালিকায় এটিকে ‘বিলাসীপণ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমদানিতে বিদেশি ফলে বিভিন্ন স্তরে—আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করসহ—১২১ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। ফলে যে ফল ২৫০ টাকায় কেনা হয়, তার জন্য সরকারকেই প্রায় ৩০০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয়।”
সাধারণ ক্রেতার অসহায়ত্ব ও প্রশাসনের পদক্ষেপ হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়া কিংবা পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ এখন চরম বিপাকে পড়েছেন। শহরের শংকরপুর এলাকার গৃহবধূ নাসিমা বেগম বলেন, “হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়ার পথে বাধ্য হয়ে সাড়ে চারশ টাকা কেজি দরে আপেল আর মাল্টা কিনতে হয়েছে। বর্তমান চড়া দামে পরিবার বা বাড়িতে নিয়মিত ফল কিনে খাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাধ্য হয়ে তাই বিকল্প হিসেবে কলা, ড্রাগন আর পেয়ারার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।”
এদিকে সাধারণ ক্রেতাদের এই অসহায়ত্ব ও অতিরিক্ত মুনাফা রোধে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, তারা নিয়মিত ফল বাজার তদারক করছেন। মণিহার এলাকার পাইকারি বাজারসহ বিভিন্ন ফলের দোকানে অভিযান চালানো হয়েছে। মূল্যতালিকা না থাকায় অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—ক্রয়মূল্যের রসিদ সংরক্ষণ এবং বিক্রয়মূল্যের তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। কোনো সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্র ক্রেতাদের জিম্মি করার চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।