রফিক মন্ডল
কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালযয়ের প্রথম ভবন। ছবি: ধ্রুব নিউজ
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পা রাখলেই প্রথমেই নজর কাড়ে বিদ্যালয়ের পুরোনো দ্বিতল ভবনটি। সময়ের চরম অভিঘাতে ভবনটির গায়ে এখন বার্ধক্যের স্পষ্ট ছাপ। বহুকালের পুরোনো লাল ইটগুলো আজ বিবর্ণ, কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ে বেরিয়ে পড়েছে ভেতরের গাঁথনি। ছাদজুড়ে জমেছে শেওলা, আর বর্ষার দিনে সেই ছাদ চুইয়ে পড়া পানিতে ভেজে ভেতেরের মেঝে। ভবনের সামনের ঐতিহ্যবাহী সারিবদ্ধ খিলানগুলো আজ ক্লান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সুউচ্চ স্তম্ভগুলোর গায়ে জমেছে অবহেলার ধুলাবালি। পুরোনো আমলের কাঠের জানালা ও দরজাগুলো পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কপাটগুলো আর ঠিকমতো আঁটে না। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, নিরবচ্ছিন্ন এক দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রয়েছে এই শতবর্ষী কাঠামোর প্রতিটা কোণে। একসময় যে ভবনের প্রতিটি করিডোর ও কক্ষ মুখরিত থাকত হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণা ও পাঠদানের গুঞ্জনে, আজ সেই প্রাণকেন্দ্রটি নিজেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক আকুল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি কেবল ইট-কাঠ-বালুর কোনো সাধারণ অবকাঠামো নয়; এটি কোটচাঁদপুরের শিক্ষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। এর পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ এক ইতিহাস। বিদ্যালয়ের নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, উনিশ শতকের শেষভাগে ১৮৯৯ সালে কোটচাঁদপুরে ‘কোটচাঁদপুর ইংলিশ হাইস্কুল’ নামে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯০১ সালের ১১ এপ্রিল বিদ্যালয়টি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করে। সেই হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ১২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষাঙ্গনে আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করে আসছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়—ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিদ্যালয়টি অগণিত গুণী মানুষ, পন্ডিত শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও দেশসেরা মেধাবী মুখ তৈরি করেছে। এই দ্বিতল ভবনটিই ছিল সেই সোনালী অধ্যায়ের মূল সূতিকাগার।
তবে প্রশ্ন হলো, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যালয়ে নতুন নতুন আধুনিক ভবন নির্মিত হলেও কেন এই পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সংরক্ষণ করা জরুরি? কেন শেওলা পড়া এই ঐতিহাসিক স্মারকটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না?
একটি জনপদের নিজস্ব পরিচিতি ও শেকড় রক্ষা করার জন্য ঐতিহাসিক স্থাপনার বিকল্প নেই। নতুন ভবন দিয়ে বর্তমানের প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, কিন্তু ১২৭ বছরের ইতিহাসের সুবাস বা অতীতের স্মৃতি নতুন ইমারত তৈরি করে কোনো দিনই ফিরিয়ে আনা যায় না। প্রাচীন স্থাপত্যের মূল নকশা, গঠনশৈলী এবং ঐতিহাসিক উপাদান টিকিয়ে রাখা মানেই নিজের ইতিহাসকে জীবন্ত রাখা। এই ভবনটির স্থাপত্যশৈলীতে যে ঔপনিবেশিক নির্মাণরীতির ছাপ রয়েছে, তা পাঠ্যবইয়ে না মিললেও এই ভবনের দেওয়ালে ছুঁয়ে দেখলেই উপলব্ধি করা যায়।
এছাড়াও কোটচাঁদপুর হাইস্কুলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বহু শিক্ষার্থী এখান থেকে শিক্ষালাভ করে দেশ ও দেশের বাইরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের শৈশবের প্রথম অক্ষর জ্ঞান, কৈশোরের দুরন্তপনা এবং জীবনের সোনালী দিনগুলো এই ভবনের করিডোর ও প্রাঙ্গণের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নতুন প্রজন্ম যখন এই ভাঙাচোরা ভবনটির পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, তখন ইতিহাসের প্রতি তাদের একধরনের টান তৈরি হয়। অথচ এই ভবনটিকেই যদি সংস্কার করে একটি স্কুল মিউজিয়াম বা ঐতিহ্য প্রদর্শনী কক্ষ হিসেবে রূপান্তর করা যায়, তবে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ইতিহাস আমাদের শেখায় অতীতকে সম্মান জানাতে এবং পূর্বসূরিদের অবদানকে শ্রদ্ধা করতে। কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি আজ সেই শ্রদ্ধাবোধ ও পরিচর্যার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
ইতিহাস রক্ষার দায় কেবল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একাই নয়, বরং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি সংঘবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে এগিয়ে আসা উচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হয়ে তারা এই ভবন রক্ষার জোরালো দাবি তুলছেন। ব্যক্তিগত অনুদান, সামাজিক উদ্যোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা সম্ভব। তবে কেবল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না; স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগেরও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে ভবনটির বর্তমান কাঠামোগত শক্তি পরীক্ষা বা স্ট্রাকচারাল অডিট করা অত্যন্ত জরুরি। ভবনটির কোন অংশগুলোতে বেশি ঝুঁকি রয়েছে এবং তা কীভাবে মূল রূপ অক্ষুণ্ন রেখে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ অনুদান বা প্রকল্পের আওতায় এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
অবহেলা আর উদাসীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের এই অমূল্য স্মারকটি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা পুরোনো ছবিতে বন্দি হয়ে থাকবে, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই যৌথ উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। ঐতিহ্য রক্ষা এবং শিক্ষার মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এই ঐতিহাসিক ভবনের পূর্ণাঙ্গ ও বৈজ্ঞানিক সংস্কার এখন কোটচাঁদপুরবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।