ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
জাপান সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছবি: পি এম ও
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্মোচিত হলো এক নতুন দিগন্ত। জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থা জোরদার এবং দুই দেশের কৌশলগত উদ্যোগ 'অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি' নতুনভাবে চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। বৈঠকে জাপানের তরফ থেকে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়, যা দেশে আনুমানিক দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় শীর্ষ নেতা দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
টেকসই অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বড় অবকাঠামোয় জাপানি অংশীদারত্ব
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন এজেন্ডা তুলে ধরে বলেন, সরকার দেশকে এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত কেন্দ্র ও শিল্প উৎপাদন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে উন্নীত হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এই বৈপ্লবিক অগ্রগতিতে জাপানের সরকার ও বেসরকারি খাতের আরও প্রত্যক্ষ ও বড় ধরনের সম্পৃক্ততা আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বিশেষ 'বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক' প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের শীর্ষ কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবক ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের সুদৃঢ় সংযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মহাকাশ বিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে জাপানের আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ।
যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশের প্রধান ছয়টি বিভাগীয় শহরকে বুলেট ট্রেনের (দ্রুতগতির রেল) নেটওয়ার্কে যুক্ত করা এবং দেশজুড়ে উড়াল সড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরে এসব মেগা প্রকল্পে জাপানের কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা চাওয়া হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিধারা অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এলএনজি অবকাঠামো, উচ্চ-দক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ 'পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া'র অধীনে সম্প্রতি ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তার জন্য জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
করনীতি সংস্কার, রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক সহযোগিতা
বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগ সহজ করতে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজীকরণ, রাজস্ব ও শুল্ক কাঠামো সংস্কার এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দ্রুত করার প্রতিশ্রুতির কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত 'অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি' (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনা করতে গিয়ে রাখাইনে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও অনিয়ন্ত্রিত রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান উল্লেখ করে মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাপানের প্রভাবশালী কূটনৈতিক ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। এ ছাড়া, একটি অবাধ, উন্মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুই দেশ একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে সভাপতি পদে সমর্থন দেওয়ায় জাপানের প্রতি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। সম্পর্কের এই গতিধারা অব্যাহত রাখতে এবং নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা মন্ত্রী পর্যায়ের সমন্বয়ে একটি 'যৌথ কমিশন' গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই শীর্ষ বৈঠককে দুই দেশের বিশ্বস্ত সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ নিমন্ত্রণ জানান।