মোবাইলের স্ক্রিনশট। ছবি: ধ্রুব নিউজ
গত বুধবার সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় ফোন বেঁজে ওঠে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালামের। মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠে নাম ‘ব্রিগেডিয়ার হাফিজ চৌধুরী। হোয়াটসআপ আইকনের ঘরে বাংলাদেশের দুটি পতাকা ক্রস আকারে রাখা। একটু সতর্কভাবে ফোন রিসিভ করলেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম। সালাম দিলে ওপ্রান্ত থেকে প্রথমেই রাশভারী কণ্ঠে ভেসে এলো ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলছি...’—‘ছাত্রদলের নেতাকে মারধর করছেন কেন? তারা মিছিল-সমাবেশ করছে কেন? প্রকৃত তথ্য জানান, বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমাকে। সঠিক তথ্য না জানালে আপনাদের চেয়ার থাকবে না’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থাতেই ছাত্ররাজনীতি করতেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সরকারি চাকরি প্রায় শেষ প্রান্তে, অনেক সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারপরও প্রথমে একটু হতচকিত হয়ে গেলেন চেয়ারম্যান। স্ক্রিনে নাম ও ছবি, রাশভারী কণ্ঠ, সম্প্রতি তার বোর্ডে সচিবের সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নানা রং মাখিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। ছাত্রদল এম এম কলেজ শাখায় মিছিল-সমাবেশ করেছে। বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। যদিও যা বলা হচ্ছে তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। অবশ্য বিএনপির নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে মিটে গেছে, ছাত্ররা এসে সরি বলে গেছে। তবুও তার রেশ কাটছে না। কয়েকজন সুযোগসন্ধানী মিডিয়া কর্মী পরিচয় দিয়ে পাল্টা নিউজ করে দেবে বলে আশ্বাস দিয়ে টাকাও চাচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ডিজি অফিসকেও তথ্য দিতে হয়েছে, ফাইলে নোট লিখে দিতে হয়েছে। এর মধ্যে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়! একজন ব্রিগেডিয়ার!
এবার কিছুটা খটকা লাগে তার। কিন্তু অত বড় নাম-পদবি...। তিনি কৌশলে কথাবার্তা চালাতে থাকেন। ওপ্রান্ত থেকে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য বলতে থাকেন, ২০১৮ সালে কোন ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন? এপ্রান্ত থেকে জানানো হলো কোনো ভোটের ডিউটি তিনি করেননি। ‘কেনো’? প্রশ্ন আসে। তাহলে ২০২৪ সালে কোনো ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন? চেয়ারম্যান জানান, ২০১৮ বা ২০২৪ সালে কোনো ভোটের ডিউটি করেননি, তাকে দায়িত্বও দেয়া হয়নি। কেন? আবার প্রশ্ন। চেয়ারম্যান জানান, তারা মনে করেছে আমাকে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
ওপ্রান্ত থেকে আবারো প্রশ্ন, ‘ছাত্রদলের ছেলেদের সাথে সমস্যা তৈরি হলো কেন?’ মনস্তাত্ত্বিক অনেক প্রশ্নের চাপ বাড়ে ওপ্রান্ত থেকে।
চেয়ারম্যান মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নম্বরটা দেখেন ০১৬১৪৬১৩৫৯২, তার আবারো খটকা লাগে। এবার বোর্ড চেয়ারম্যান ইংরেজিতে কথাবার্তা শুরু করেন। ওপ্রান্তে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলো। তিনি জানালেন, তিনি তাহলে সচিব ও মন্ত্রীকে বোর্ডের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেবেন। চেয়ারম্যান জোর গলায় বলেন, যাকে খুশি বলেন, বলবেন প্রফেসর ফারুখ ছালাম এসব কথা জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফারুখ ছালামকে জানে এবং চেনে। এরপর একসময় চেয়ারম্যান বললেন, ‘আপনি যা ইচ্ছে তা করেন, যাকে যা বলার তা বলেন, কোনো সমস্যা নেই...।’ তিনি ফোন কেটে দেন।
এসব বিষয়ে পরবর্তীতে প্রফেসর ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম জানান, একটা ছোট বিষয় নিয়ে একবার সুযোগসন্ধানী সাংবাদিক নামধারীরা, একবার হাই অফিসিয়াল সেজে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দোহাই দিয়ে প্রতারকরা ফোন দিচ্ছে। যশোর বোর্ড ১০ জেলার একটি প্রতিষ্ঠান, তার কর্মকর্তারা একেবারে সাধারণ মানুষ না; তারপরও তাদেরকে যদি চারিদিক থেকে এভাবে প্রতারণার জাল ছিন্ন করতে হয়, তাহলে প্রতিদিন সাধারণ ও মধ্যমানের চাকরিজীবী ও ক্ষতিগ্রস্তরা কত ফাঁদে পড়ছে! একটু সম্মান নিয়ে চলতে চাওয়া মানুষরা এখন এসব ফাঁদে পড়ে কতটা অনিরাপদ, এটাই ভাবছি।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. আব্দুল মতিনকেও একজন ব্রিগেডিয়ার পরিচয় দিয়ে ফোন করে তথ্য জানতে চাইলে তিনি জানিয়ে দেন, ‘আপনার প্রতিনিধি পাঠান, তথ্য যা যা লাগে দিয়ে দেবো, ফোনে আলাপ করতে চাই না।’
গত ১৬ আগস্ট বোর্ডের নাম সংশোধন সভায় সরকারি এম এম কলেজের ছাত্রদলের একজন ওই সভার প্রধান বোর্ড সচিব ড. আব্দুল মতিনের একটি কথার অপব্যাখ্যা করে পরদিন মিছিল-সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেয়ার ঘটনা ঘটলে একই দিন সন্ধ্যার পর জেলা বিএনপির হস্তক্ষেপে ভুলবোঝাবুঝির অবসান হয়। ছাত্ররা শিক্ষকের কাছে বিনয় প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে ফিরে যান। ঘটনা সেখানেই শেষ হয়। কিন্তু নানা প্রতারকদের ফাঁদ চলছেই। যদি শিকার ধরা পড়ে।