Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সুদ থেকে বাঁচতে আপনাকে যা জানতেই হবে

মো. জিহাদুজ্জামান মো. জিহাদুজ্জামান
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল,২০২৬, ১০:৪০ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ১০ এপ্রিল,২০২৬, ০১:১৫ এ এম
সুদ থেকে বাঁচতে আপনাকে যা জানতেই হবে

দিপিতা হযরত আদম (আ.)-এর যুগে প্রধান অর্থনৈতিক উপকরণ ছিল কৃষি ও পশু শিকার। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে মানুষ বৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্য উৎপাদন, বিনিময়, বাজারনীতিসহ জটিল মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি শুরু হয়। এভাবে চলতে চলতে কোনো একদিন অর্থনীতিতে সুদ ঢুকে পড়ে। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে রচিত সুমেরীয় নথিপত্রে শস্য ও ধাতু ভিত্তিক আদান-প্রদানে সুদের ধারণা পাওয়া যায়। তবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ অব্দে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের গোড়াপত্তন ধরা হয়। তখন কৃষি পণ্যের জন্য কৃষকদের বার্ষিক ২০ শতাংশ হারে মূলধন সংগ্রহ করা হতো এবং সুদ অনাদায়ে দাসত্ব বরণ করা লাগত।

ধর্মীয়ভাবে ইহুদিরা সুদের ব্যাপক প্রচলন শুরু করে। পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১৬০-১৬১ নম্বর আয়াতে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এছাড়া ফেরাউনও তার শাসনামলে সুদের ব্যাপক প্রচলন করে, যা এক হাজার বছর ধরে চলতে থাকে।

সুদের সংজ্ঞা
আরবি 'রিবা' শব্দের বাংলা অর্থ সুদ এবং ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Interest.

১. সাধারণ সংজ্ঞা: সুদ হলো এমন একটি পরিশোধ যা একজন ঋণগ্রহীতা বা আমানত গ্রহণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, একজন ঋণদাতা বা আমানতকারীকে দেয়; যা মূল ঋণ ফেরতের অতিরিক্ত একটি নির্দিষ্ট হারে প্রদেয় অর্থ। (সূত্র: ইংলিশ অক্সফোর্ড লিভিং ডিকশনারি)

২. ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ: লেনদেন করার সময় সেই অতিরিক্ত সম্পদকে সুদ বলা হয়, যা কোনো এক পক্ষ শর্ত অনুসারে বিনিময় ছাড়াই লাভ করে। সহজ কথায়, সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ে অথবা মুদ্রা বিনিময়ে (সময়ের ব্যবধানে অথবা একই সময়ে) কম পরিমাণের সাথে বেশি পরিমাণ লেনদেন হলে অতিরিক্ত অংশটুকুই সুদ।

'ক্ষতি-অপকার-কুপ্রভাব' বইয়ে সুদের ৩০টি কুপ্রভাব আলোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. আত্মিক-চারিত্রিক ক্ষতি: অন্তরে কৃপণতা, নির্দয়তা ও অর্থলিপ্সা স্থান করে নেয়। ২. সামাজিক ক্ষতি: সমাজে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসে না। স্বার্থ ছাড়া কেউ কাউকে সাহায্য করে না। বিত্তশালীরা নিঃস্বদের ঘৃণা করে। ৩. অর্থনীতিতে ব্যাপক অনিষ্ট শুরু হয়। ৪. মানুষের কর্মশক্তিকে অকার্যকর বানিয়ে দেয়। ৫. ইসলামী সমাজেও সুদের দাবানল ঢুকে পড়ে। ৬. মানুষের কাছে অলস টাকা বৃদ্ধি পায়। ৭. মুসলমানদের টাকা অমুসলিমের নিকট চলে যায়। ৮. সুদ বর্বর যুগের লোকেদের কাজ। ৯. সুদখোরকে কিয়ামতের দিন পাগল হিসেবে উঠানো হবে। (সূরা বাকারা-২৭৫) ১০. আল্লাহ সুদের মাধ্যমে আহরিত সম্পদ নির্মূল ও ধ্বংস করেন। (সূরা বাকারা-২৭৬)। সুদের মাধ্যমে সম্পদ বাড়ে না। (সূরা রূম-৩৯) ১১. সুদী কারবার বান্দাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ করে। (সূরা বাকারা-২৭৯) ১২. সুদ খোদাভীতি ও চারিত্রিক দুর্বলতা প্রমাণ করে। ১৩. সুদখোরকে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছে। (সূরা বাকারা-২৭৫) ১৪. সুদখোরের দোয়া কবুল হয় না। ১৫. সুদ খেলে অন্তর কঠোর হয় এবং তাতে মরিচা পড়ে। ১৬. সুদখোর কল্যাণ আহরণের সকল উপলক্ষ থেকে বঞ্চিত হয়। ১৭. সুদ ব্যক্তি ও দলের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা তৈরি করে।

এছাড়া হাদীসে সুদের ব্যাপক কুপ্রভাবের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন— ১৮. সুদ সংশ্লিষ্ট চার পক্ষের লোককে আল্লাহর রাসূল (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। (মুসলিম-৪১৭৭) ১৯. সুদখোরের পেট ঘরের মতো বড় হবে এবং তা সাপ দিয়ে পূর্ণ থাকবে। (ইবনে মাজাহ-২২৭৩) ২০. সুদের সত্তরটিরও বেশি গুনাহ যার সর্বনিম্নটি নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো ভয়াবহ। (ইবনে মাজাহ)

সুদ থেকে বাঁচার উপায়

১. সুদ নয়, ব্যবসাকে প্রাধান্য দিতে হবে। ২. ঋণ দিয়ে কোনো বিনিময় গ্রহণ করা যাবে না। করজে হাসানা বা উত্তম ঋণ চালু করতে হবে। ৩. যাকাতের ব্যাপক প্রচলন ও উৎসাহ প্রদান করতে হবে। ৪. ইসলামী অর্থব্যবস্থার পূর্বশর্ত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। ৫. প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকের পরিবর্তে ইসলামী ব্যাংকে সকল লেনদেন করার চেষ্টা করা। ৬. নামাজ শেষে এই দোয়া করা— "হে প্রভু! আমাদেরকে সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দিন।"

আলেমগণ নিম্নোক্ত দোয়াটি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন: "হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই— দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণভার ও মানুষের প্রভাবাধীন হওয়া থেকে।"

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সংজ্ঞা

ওআইসি (OIC) প্রদত্ত ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা হলো: "ইসলামী ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যার বিধি ও পদ্ধতিসমূহ ইসলামী শরীয়াহর নীতি অনুসরণ করে এবং এটি এর সকল কার্যক্রমে সুদ গ্রহণ ও প্রদান নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করে।"

এই সংজ্ঞা অনুসারে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল বিষয়গুলো হচ্ছে:

·         শরীয়াহ পরিপালন: এটি ইসলামী শরীয়তের নীতি মেনে চলে।

·         সুদবিহীন লেনদেন: সকল প্রকার সুদ গ্রহণ ও প্রদান নিষিদ্ধ।

·         লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব: লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে লেনদেন হয়।

·         নৈতিক ব্যাংকিং: এটি নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।

সুতরাং যে ব্যাংকের কোনো স্তরে সুদের লেনদেন হবে, তাকে ইসলামী ব্যাংক বলা যাবে না।

ইসলামী ব্যাংকের আমানত গ্রহণ পদ্ধতি

ইসলামী ব্যাংক সাধারণত 'মুদারাবা' পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ করে। এর অর্থ হলো উদ্যোগ গ্রহণ। এখানে এক পক্ষ মূলধন সরবরাহ করে (যাকে বলা হয় সাহিব আল মাল) এবং অপর পক্ষ শ্রম দেয় (যাকে বলা হয় মুদারিব)। লাভ হলে চুক্তি অনুযায়ী বণ্টন হয়, আর লোকসান হলে যার যতটুকু মূলধন সে ততটুকু বহন করে।

ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ (লোন) পদ্ধতি

ইসলামী ব্যাংক প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ প্রদান করে: ১. ক্রয়-বিক্রয় (বাই): কোনো পণ্য ক্রয় করে তা লাভ যোগ করে নগদ বা বাকিতে বিক্রয় করা। ২. অংশীদারী ব্যবসা (মুশারাকাহ): ব্যাংক মূলধন দিবে এবং গ্রাহক শ্রম দিবে বা ব্যবসা পরিচালনা করবে। লাভ-লোকসান চুক্তি ও মূলধন অনুযায়ী বণ্টন হবে। ৩. ভাড়া প্রদান (ইজারা): ব্যাংক বাড়ি, গাড়ি বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করে গ্রাহকের নিকট ভাড়া প্রদানের শর্তে প্রদান করে।

ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে প্রচলিত কিছু প্রশ্নের উত্তর

১. নির্ধারিত মুনাফা কি সুদ? উত্তর: ধরুন আপনি একজন মুদি ব্যবসায়ী। আপনি এক বস্তা চাল ক্রয়ের পর খরচ বাদ দিয়ে ১০ টাকা লাভ করতে চান। এটা যেমন সুদ নয় বরং ব্যবসার নীতি, তেমনি ব্যাংক যদি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে একটি নির্ধারিত লাভ করে, তবে তা সুদ নয়।

২. ইসলামী ব্যাংক কি ঘুরিয়ে সুদ খায়? উত্তর: এটি ঘুরিয়ে খাওয়া নয়, বরং শরীয়াহর কৌশল। যেমন— মুরগি জবাই করার সময় আল্লাহর নাম বললে তা হালাল, না বললে হারাম। তেমনি শরীয়াহ মেনে ক্রয়-বিক্রয় বা অংশীদারিত্ব পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করলে তা হালাল।

৩. সুদ আর ব্যবসা কি একই জিনিস? উত্তর: অবশ্যই নয়। সূরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন— "তারা বলে ব্যবসা তো সুদের মতো।" আসলে ব্যবসা হলো ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে পরিশ্রম, ক্ষতির আশঙ্কা ও ঝুঁকি আছে; যা সুদী কারবারে নেই।

৪. বিনিয়োগের পর পণ্য নষ্ট হলে ব্যাংক কি ঝুঁকি নেয়? উত্তর: অংশীদারিত্ব পদ্ধতিতে লোকসান হলে ব্যাংক মূলধন অনুযায়ী তা বহন করে। তবে ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতিতে গ্রাহকের কাছে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার পর তা নষ্ট হলে ব্যাংক দায় নিবে না। যেমন— দোকান থেকে ডিম কিনে বাড়ি ফেরার পথে ভেঙে গেলে দোকানদার তার দায় নেয় না।

৫. সবাই লাভ পায় কেন, ব্যাংক কি কখনো লোকসান দেয় না? উত্তর: ব্যাংকের হাজারো গ্রাহক ও প্রজেক্ট থাকে। কোনোটিতে লোকসান হলেও অন্যগুলোতে লাভ হয়। মোটের ওপর যে লাভ থাকে, তা চুক্তি অনুযায়ী বণ্টন করা হয়।

সুদের ভয়াবহতা থেকে সমাজ ও দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে মুসলমানদের, বিশেষ করে আলেম সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

লেখক: ব্যাংকার ও ইসলামী গবেষক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)