পশ্চিম আকাশে গতকাল ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুমিনের দুয়ারে হাজির হয়েছে দয়াময় আল্লাহতায়ালার রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের অশেষ ফল্গুধারা। তারাবির নামাজ ও সাহ্রির প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রোজার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। আত্মশুদ্ধি, আত্ম-সংশোধন, আত্ম-উন্নয়ন ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মহিমায় ভাস্বর এই মাসে প্রতিটি মুমিন মহান আল্লাহর বিশেষ মেহমানে পরিণত হয়।
ইসলামের বিধানে রমজানুল মোবারক বছরের বাকি এগারো মাসের চেয়ে অধিক মর্যাদাশীল ও বরকতপূর্ণ। এ মাসের বিশেষত্ব অপরিসীম। এ মাসেই মানুষ ও জিন জাতির মুক্তির সনদ পুরো কোরআন মজিদ লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে বায়তুল ইজ্জতে অবতীর্ণ হয়। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সর্বপ্রথম এ মাসেই অহি অবতীর্ণ হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত ও সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
সহিহ মুসলিম শরিফের ১০৭৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহতায়ালার রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অন্য এক হাদিসে এ মাসের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এভাবে, যখন রমজান মাসের শুভাগমন হয়, জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৭৭)
রমজানুল মোবারক জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়ার মাস। সুতরাং, বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি, ক্ষমা প্রার্থনা ও নেক আমলের মাধ্যমে পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তির পরওয়ানা লাভের এটিই সুবর্ণ সুযোগ। হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহতায়ালা রমজানের প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। (মুসনাদে আহমদ: ২২২০২)
পবিত্র রমজান মাসে প্রতিটি আমলের সওয়াব ৭০ থেকে ৭০০ গুণ কিংবা তারও বেশি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমজানের ওমরাহ, হজ সমতুল্য। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৯৩৯)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল। (শোয়াবুল ঈমান, বায়হাকি: ৩/৩০৫-৩০৬) অর্থাৎ এ মাসে নফল ইবাদতে অন্য মাসের ফরজের মতো সওয়াব হয়। আর এ মাসের একটি ফরজ আদায়ে অন্য মাসের ৭০টি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব হয়।
রোজার সওয়াব সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, নিশ্চয় রোজা আমার জন্য, আর এর প্রতিদান স্বয়ং আমিই দেব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৫১) রোজা আল্লাহর জন্য হওয়ায় এর প্রতিদানের সীমা-পরিসীমা শুধু আল্লাহই জানেন।
যেহেতু রমজান রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভের মাস, তাই এ মাস পেয়েও যে ব্যক্তি নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, তার জন্য হজরত জিবরাঈল (আ.) বদদোয়া করেছেন এবং নবী করিম (সা.) বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হওয়া সত্ত্বেও আমিন বলে সমর্থন জানিয়েছেন।
হাদিস শরিফে এসেছে, নবী করিম (সা.) মিম্বরে উঠে তিনবার আমিন, আমিন, আমিন বললেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে রাসুল! আপনি তো এমন করতেন না। নবী (সা.) ইরশাদ করলেন, জিবরাঈল আমাকে বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েও (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। তখন আমি বললাম, আমিন। এরপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি বললাম, আমিন। জিবরাঈল (আ.) আবার বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার কাছে আমার নাম আলোচিত হলো, অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। আমি বললাম, আমিন। (আল আদাবুল মুফরাদ: ৬৪৬)
রমজানের মতো এমন বরকতময় মাস আমরা পেয়েছি, এটি আমাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ রহমত। তাই এখন আমাদের কর্তব্য হলো রমজানের হক আদায় করা ও পবিত্রতা রক্ষা করা। নবীর (সা.) সম্মতি দেওয়া বদদোয়া থেকে রক্ষা পেতে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং পাপ ও কলুষতা থেকে মুক্তি পেতে পবিত্র চিত্তে দোয়া করা। রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ, তওবা-ইস্তিগফার ও সদকায়ে জারিয়ায় ভরিয়ে তুলি। এই মাসে আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা– আসুন আমরা সবাই সেই রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় নিই।