আল জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
হামলার প্রধান সন্দেহভাজন কো-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হামাম আল-হামামি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
ইসরায়েলগামী একটি ফ্লাইটের পাইলটকে আক্রমণের দায়ে অভিযুক্ত ফ্লাইদুবাইয়ের এক কো-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। উগ্রপন্থী মনোভাবের উদ্বেগে তিনি নিজ দেশে উড্ডয়নের ওপর পূর্বনিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি ছিলেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
তবে এই পাইলটের পরিচিতি কিংবা তার আদর্শিক বিশ্বাসের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) শনিবার এক বিবৃতিতে ফ্লাইট 'এফজেড১০৭৩'-এ ঘটে যাওয়া ঘটনাকে একটি সম্ভাব্য "সন্ত্রাসবাদী হামলা" হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জানায়, অভিযুক্ত সহ-পাইলট বিমানে থাকা জরুরি কুড়াল দিয়ে ওই ফ্লাইটের প্রধান পাইলট ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছারকে আক্রমণ করেন এবং বিমানটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালান।
তবে তদন্তকারীরা এখনো এই হামলার আসল উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে অন্য কারও যোগসাজশ ছিল কি না তা উদঘাটনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ঘটনার পর পাইলটদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাই এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযুক্ত পাইলট সম্পর্কে যা জানা গেছে
দুবাই থেকে তেলআভিভগামী ১৭৪ জন আরোহীবাহী ফ্লাইটের পাইলটের ওপর হামলার প্রধান সন্দেহভাজন কো-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হামাম আল-হামামি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক উপসাগরীয় কূটনীতিক ও এক পশ্চিমা কূটনীতিকসহ তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা এপি-কে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো এই তথ্য সরবরাহ করে। উক্ত উপসাগরীয় কূটনীতিক জানান, তিনি এককভাবে এই হামলা চালিয়েছেন নাকি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল—তদন্তকারীরা তা উদঘাটনে কাজ করছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, আল-হামামি ওমানের নাগরিক হলেও তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক সিরীয় মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবনের বেশ কয়েক বছর আমিরাতেই কাটিয়েছেন।
তার পূর্ববর্তী বিমান চালনা ক্যারিয়ার এবং দুবাইভিত্তিক স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইনটিতে যোগ দেওয়ার আগে কোনো সতর্কবার্তা কিংবা অনিয়ম ধরা পড়েছিল কি না—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্রের বরাতে শুক্রবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অভিযুক্ত এই কো-পাইলট চরমপন্থী মতাদর্শ পোষণ করেন—এমন উদ্বেগের কারণে ওমানি কর্তৃপক্ষ আগেই তার দেশের আকাশে বিমান ওড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
তা সত্ত্বেও, তার কথিত উগ্রবাদী আদর্শগুলো ঠিক কেমন ছিল কিংবা ওমান তাদের এই উদ্বেগের কথা অন্যান্য দেশ বা বিমান সংস্থাগুলোকে জানিয়েছিল কি না—তা এখনো অস্পষ্ট।
সিএনএন পৃথকভাবে আঞ্চলিক এক কূটনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে আল-হামামিকে আগে ফ্লাইট ট্রেনিং থেকে সরিয়ে দিয়ে অন্য পদে বদলি করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওই সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, আল-হামামির নামানুসারে থাকা একটি লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী তিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সাত বছর 'ওমান এয়ার'-এ কাজ করেছিলেন। প্রোফাইলটির তথ্যমতে, তিনি ২০২৫ সালের জুনে 'রয়েল এয়ার মারোক'-এ যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে দেন।
এখন এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আল-হামামি যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।
'প্রেস অ্যাসোসিয়েশন'-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে 'বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির' এক মুখপাত্র বলেন, 'এই ঘটনায় আহত পাইলট, ক্রু এবং যাত্রীদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল।'
তিনি আরও বলেন, 'হামাম আল-হামামি আগে দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে একটি কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ধরনের পাইলট ট্রেনিং গ্রহণ করেননি।'
ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এ ঠিক যা ঘটেছিল
'ফ্লাইটরডার২৪'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার সকাল ৭:০৫ মিনিটে (০৩:০৫ জিএমটি) ১৭৪ জন আরোহী নিয়ে দুবাই থেকে তেলআভিভের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ এবং এটি ৩৪ হাজার ফুট (১০,০০০ মিটারেরও বেশি) উচ্চতায় ওঠে। যাত্রা শুরুর দুই ঘণ্টার কিছু সময় পর বিমানটি আকস্মিকভাবে নিচে নামতে শুরু করে; প্রথমে তীব্রভাবে নিচে নেমে এসে আবার উপরে উঠে এবং পরবর্তীতে আবারও নিচে নামতে থাকে।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা থেকে জানা যায়, বিমানটি মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ১৭ হাজার ফুটেরও বেশি নিচে নেমে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। কো-পাইলট ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বিমানে থাকা ভারতীয় প্রধান পাইলট স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা চালান।
আবু ধাবির একটি হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে কথা বলার সময় মাচ্ছার জানান, বিমানটি যখন নিচে নেমে আসছিল, তখন তিনি নিজেকে গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের মেঝতে পড়ে থাকতে দেখেন।
তিনি বলেন, 'আমি যখন নিচে পড়ে ছিলাম, তখন বুঝতে পারছিলাম যে বিমানটি তীব্র গতিতে নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। আমি জানতাম কিছু করার জন্য এটাই আমার শেষ সুযোগ।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি বুঝতে পারছিলাম বিমানটি নিচে পড়ে যাচ্ছে... আমি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বললাম, দরজাটা তো ঠিক সামনেই, যেকোনো মূল্যে এটা খুলে দিতে হবে। আমি কোনোমতে দরজাটা খুলতে সক্ষম হই এবং বাইরের লোকজন ভেতরে ঢুকে পড়ে।'
যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে কো-পাইলটকে কাবু করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় এসে সমতায় ফিরে আসে। এরপর বিমানটির ট্র্যান্সপন্ডারের সিগন্যাল কোড বদলে '৭৫০০' করা হয়, যা বিমানে অনাকাঙ্ক্ষিত বা বেআইনি অনুপ্রবেশের (অধিগ্রহণ) সংকেত নির্দেশ করে।
বিমানে যাত্রী হিসেবে থাকা দুজন রিজার্ভ পাইলট দ্রুত ফ্লাইটটির নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবুকে বিমানটি জরুরি অবতরণ করান। স্থানীয় সময় সকাল ৯:৪৫ মিনিটে (০৬:৪৫ জিএমটি) বিমানটি নিরাপদে মাটিতে নেমে আসে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে চিকিৎসকদের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তাদের আবু ধাবিতে স্থানান্তর করা হয়।
এই হামলা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত যা জানিয়েছে
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি শনিবার জানান, তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে কো-পাইলট একটি "সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড" পরিচালনা শুরু করেছিলেন।
আল-শামসির মতে, কো-পাইলট ককপিটে থাকা জরুরি কুড়াল দিয়ে প্রধান পাইলটের ওপর হামলা চালান এবং 'বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন।'
'ক্র্যাশ এক্স' বা জরুরি কুড়াল হলো ককপিটে রাখা একটি বিশেষ সরঞ্জাম, যা জরুরি মুহূর্তে বিমান কেটে বের হওয়ার জন্য পাইলটরা ব্যবহার করে থাকেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার আল-শামসি তদন্তকারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এই ঘটনাটি কোনো "সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা উদ্দেশ্যের" সাথে সম্পর্কিত কি না, কিংবা এতে পূর্বপরিকল্পনা ও কারও নির্দেশনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মূল উদ্দেশ্য প্রকাশ করেনি এবং আল-হামামি একা কাজ করেছেন কি না, সে বিষয়েও কিছু নিশ্চিত করেনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টবিষয়ক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ শনিবার বলেন, এই 'সন্ত্রাসবাদী' হামলা আমাদের জন্য নতুন একটি সতর্কবার্তা যে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, 'এই ঘটনাটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শুরু থেকেই নেওয়া কঠোর অবস্থানের গুরুত্বকে আবারও পুনর্ব্যক্ত করে: উগ্রবাদের প্রতি কোনো ছাড় নয় এবং এর উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতি কোনো নমনীয়তা নয়। নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ঘৃণা রুখে দেওয়া এবং উগ্রবাদের উৎসগুলো শুকিয়ে ফেলা।'
তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা
বর্তমানে আবু ধাবি এই তদন্ত প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রসিকিউটররা এই হামলার সার্বিক পরিস্থিতি, এর পেছনের উদ্দেশ্য এবং অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে এর সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন।
এর আগে আল-শামসি জানান, ঘটনার স্থান দেশের বাইরে হলেও এই ঘটনার ওপর বিচারিক এখতিয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতেরই থাকবে। কারণ বিমানটি আমিরাতে নিবন্ধিত এবং তাদের পতাকা বহন করে। ফলে বিমানের ভেতরে সংঘটিত যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আমিরাতের আইন প্রযোজ্য হবে।
শনিবার আল-শামসি জানান, কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং ডিজিটাল ও ভৌত প্রমাণাদি পর্যালোচনার পাশাপাশি তদন্তকারীরা "ঘটনার সমস্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা, এর পেছনের উদ্দেশ্য এবং আনুষঙ্গিক যোগসূত্র উন্মোচনে" কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
জরুরি ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে চলমান তদন্তের মধ্যে ইসরায়েলে ফ্লাইদুবাইয়ের সমস্ত ফ্লাইট পরিচালনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।