আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ সিরিজের যুদ্ধবিমান চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত করে বিশ্বজুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে ইরান। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে সাম্প্রতিক সশস্ত্র সংঘাতে আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ সিরিজের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের প্রাথমিক দাবি অনুযায়ী, অত্যন্ত শক্তিশালী এই যুদ্ধবিমানটি চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়ে থাকতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে বিধ্বস্ত হওয়া এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল বিমানটি মূলত চীনা তৈরি স্বল্পপাল্লার উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘ম্যানপ্যাড’ দিয়ে নিখুঁতভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে, তবে পুরো বিষয়টি এখনও পেন্টাগনের উচ্চপর্যায়ে তদন্তাধীন রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গোপন আশঙ্কা, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময়ে চীন হয়তো ইরানকে অতিরিক্ত গোপন সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে মার্কিন রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম স্টেলথ বিমান প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার রাডার সিস্টেমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মূলত ইরানের সামরিক বাহিনীকে যেকোনো আধুনিক যুদ্ধবিমান খুব সহজে শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছে।
এই প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামগুলোই মূলত মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগলের মতো আকাশপথের ত্রাস ও উন্নত যুদ্ধবিমান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা রাতারাতি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা।
মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিতের ঘটনার পরপরই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন যে, বিমানটি মাটিতে অবস্থানকারী শত্রুপক্ষের কাঁধে বহনযোগ্য একটি ছোট ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই বিধ্বস্ত হয়েছে, যা সামরিক পরিভাষায় ‘ম্যানপ্যাড’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
এগুলো সাধারণত অত্যন্ত ছোট, সহজে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যা মূলত যেকোনো সৈনিক কাঁধে বহন করে নিচু আকাশে উড়ন্ত যুদ্ধবিমানের দিকে নিখুঁতভাবে নিক্ষেপ করতে পারেন। সামরিক বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লম্বায় প্রায় ৭ ফুট হয়ে থাকে এবং এগুলোর মোট ওজন মাত্র ৪০ পাউন্ডের কাছাকাছি রাখা হয়, যাতে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা সহজ হয়।
আমেরিকান এই যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর ভেতরে থাকা ক্রুদের খুঁজে বের করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর প্রায় ৩৬ ঘণ্টার একটি বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়েছিল। গত এপ্রিলে কীভাবে আমেরিকান এই জেটটিকে শত্রুপক্ষ নিখুঁতভাবে গুলি করে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছিল, তা মার্কিন গোয়েন্দারা এখনও চুলচেরা তদন্ত করছেন।
বৈশ্বিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটিকে আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক দশকের মধ্যে আকাশযুদ্ধে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান শত্রুপক্ষের সরাসরি গুলিতে ভূপাতিত হওয়ার লজ্জাজনক ঘটনা এটিই প্রথম।
বিধ্বস্ত হওয়া ওই বিমানটিতে দুজন দক্ষ ক্রু সদস্য ছিলেন, যারা বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন। ঘটনার পর প্রায় সাত ঘণ্টার দীর্ঘ চেষ্টার পর বিমানের মূল পাইলটকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে বিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে খুঁজে পেতে মার্কিন উদ্ধারকারী দলটির আরও অনেক বেশি সময় লেগেছিল।
পেন্টাগনের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ওই দ্বিতীয় ক্রু সদস্য নিজেকে বাঁচাতে ইরানের দুর্গম জাগ্রোস অঞ্চলের গভীর পাহাড়ি গুহায় লুকিয়ে ছিলেন এবং নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই দিন পর মার্কিন বিশেষ কমান্ডো দল তাকেও অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চীন ঠিক কখন এবং কোন রুট ব্যবহার করে ইরানকে এই বিশেষ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, তা এখনও শতভাগ নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে ইরান যদি এই যুদ্ধে সত্যিই চীনের তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তা আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও ভয়াবহ রূপ দিতে পারে। এছাড়া ওয়াশিংটন এখন এই চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বেইজিংকে পরোক্ষভাবে ইরানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ও সমর্থনকারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
এই বিপজ্জনক ঘটনাটি ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের স্থায়ী অবসানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরাসরি সাহায্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ এনেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ট্র্যাক ও গোয়েন্দা নজরদারি করতে ইরানকে একচেটিয়াভাবে চীনা স্যাটেলাইট পরিষেবা ব্যবহারের অবৈধ সুযোগ দিয়ে সাহায্য করছে বেইজিং। এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তিনটি শীর্ষ চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে, যদিও ওয়াশিংটনের এই সব অভিযোগ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে চীন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জনপ্রিয় ফক্স নিউজকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, চীনের রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং ব্যক্তিগতভাবে তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন এই মুহূর্তে ইরানে কোনো ধরনের মারাত্মক অস্ত্র পাঠাচ্ছে না।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্যক্তিগতভাবে আমাকে জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ইরানে কোনো অস্ত্র পাঠাচ্ছেন না। এটি কূটনৈতিকভাবে একটি চমৎকার প্রতিশ্রুতি। আমি তার মুখের কথায় পূর্ণ বিশ্বাস করি এবং মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমি এর ভূয়সী প্রশংসা করি।