আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন কংগ্রেস প্রধান রাহুলগন্ধি ছবি: সংগৃহীত
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন করছে থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)। কংগ্রেস, স্থানীয় দল ভিসিকে এবং বামপন্থীদের দুই দল সিপিআই ও সিপিএমের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করছে তারা। এর মধ্য দিয়ে চার দিন ধরে তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন নিয়ে চলা নাটকীয়তার অবসান ঘটেছে। আজ সকালে তামিলনাড়ু রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তামিলনাড়ুর তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে) দলের প্রধান থালাপতি বিজয়।
আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে শপথ নেন থালাপতি। গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে শপথ পড়ান।
তামিলনাড়ুর নতুন সরকারের শপথ নেওয়া অন্য মন্ত্রীরা হলেন—এন আনন্দ, আধব অর্জুন, রাজমোহন, আর নির্মল কুমার, পি ভেঙ্কটরামানান, কে জি অরুণ রাজ, কে এ সেনগোট্টাইয়ান, টি কে প্রভু ও সেলভি এস কীর্তনা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিক ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ছিলেন থালাপতি বিজয়ের মা–বাবা, অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণানসহ আমন্ত্রিত অতিথি ও সমর্থকেরা। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও এসেছিলেন। জোট গঠন নিয়ে কয়েক দিনের নাটকীয়তার পর গতকাল শনিবার দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে লোকভবনে গিয়ে গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের সঙ্গে বৈঠক করেন থালাপতি বিজয়। এরপর তিনি বিজয়কে সরকার গঠনের আহ্বান জানান।
গত সোমবার তামিলনাডু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে সবচেয়ে বেশি আসন পায় তামিল চলচ্চিত্রের নায়ক থেকে রাজনীতিতে এসে চমক দেখানো থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে)। তারা পায় ১০৮টি আসন। এর মধ্যে ৫১ বছরের থালাপতি জিতেছেন দুটি আসনে।
তামিলনাড়ুর ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১৮টি আসন। গত শুক্রবার পর্যন্ত টিভিকের সমর্থন ১১৬ আসনে আটকে ছিল। এ কারণে গভর্নর সরকার গঠনের আহ্বান জানাননি।
গতকাল বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চির (ভিসিকে) ও ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল) নামের দুটি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকেকে সমর্থন দিলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এ দুই দলের দুটি করে চারটি আসন যোগ হয়ে জোটের শক্তি দাঁড়ায় ১২০ আসনে।
গভর্নরের কাছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) সিপিআই(এম)-এর সমর্থনপত্র জমা দিয়েছেন থালাপতি।
তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো কয়েকটি দল মিলে জোট সরকার গঠন করেছে।
সকাল ১০টায় চেন্নাইয়ের নেহরু স্টেডিয়ামে শপথ অনুষ্ঠান হয়। সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু করা থেকে মুখ্যমন্ত্রী—বিজয়ের জীবন সিনেমার মতোই নাটকীয়।
শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু
বিজয় জন্ম থেকেই সিনেমার পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন জনপ্রিয় তামিল নির্মাতা। বাবার পরিচালিত ১৯৮৪ সালের ছবি ‘ভেটরি’তে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় বিজয়ের।
এক সাক্ষাৎকারে এস এ চন্দ্রশেখর জানিয়েছিলেন, সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিজয়কে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫০০ রুপি। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, একদিন এই শিশুশিল্পীই দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন।
চন্দ্রশেখর আরও দাবি করেন, বহু আগেই তাঁর ছেলে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি একদিন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হব।’
৫০০ টাকা থেকে ২২০ কোটি
বর্তমানে বিজয়ের পারিশ্রমিক নিয়ে পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতেই আলোচনা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তাঁর শেষ ছবি হিসেবে প্রচারিত ‘জন নায়গন’-এর জন্য তিনি প্রায় ২২০ কোটি রুপি নিয়েছেন।
অর্থাৎ ৫০০ টাকা থেকে ২২০ কোটি—পারিশ্রমিকের এই বৃদ্ধি প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ শতাংশের বেশি। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন উত্থান খুব কম অভিনেতার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।
‘ঘিল্লি’ বদলে দেয় ক্যারিয়ার
১৯৯০-এর দশকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়লেও বিজয়ের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০৪ সালের ব্লকবাস্টার ‘ঘিল্লি’। ছবিটি তাঁকে সাধারণ দর্শকের কাছে ‘মাস হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ‘কোকিরি’, ‘কাভালান’, ‘নানবান’, ‘থুকাক্কি’, ‘মারসেল’, ‘সককার’ ও ‘বিগিল’।
প্যান-ইন্ডিয়া না হয়েও সুপারস্টার
ভারতের অন্য তারকারা যখন প্যান-ইন্ডিয়া ছবির দিকে ঝুঁকেছেন, বিজয় তখনো মূলত তামিল ছবিতেই অভিনয় করে গেছেন। তবু তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি একটুও।
‘লিও’ বিশ্বজুড়ে ৬০০ কোটির বেশি আয় করেছিল। এরপর ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ ও বিশ্বব্যাপী ৪০০ কোটির বেশি ব্যবসা করে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বিজয়ের দর্শক টানার ক্ষমতা কতটা বিশা
সিনেমা ছেড়ে রাজনীতিতে
ক্যারিয়ারের একেবারে শীর্ষ সময়ে দাঁড়িয়ে বিজয় ঘোষণা দেন, তিনি রাজনীতিতে পূর্ণ সময় দিতে সিনেমা থেকে সরে যাবেন। সে কারণেই ‘জন নায়গন’কে তাঁর শেষ ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভক্তদের কাছে বিষয়টি আবেগঘন হয়ে উঠেছে। কারণ, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তামিল সিনেমার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, আগামী ২২ জুন বিজয়ের জন্মদিনে মুক্তি পাবে ‘জন নায়গন’।