আল জাজিরা
আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির একাধিক শহরে ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইসরায়েলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আক্রমণকে "বড় ধরনের সামরিক অভিযান" (Major Combat Operations) হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে চলমান উত্তজনা এবং কয়েক সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি হুমকির পর এই হামলার ঘটনা ঘটল। উল্লেখ্য, মাত্র আট মাস আগেই ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী একটি যুদ্ধ হয়েছিল।
বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েল—উভয় দেশেই ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
ইরানের কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে
শনিবার সকালে ইসরায়েল প্রথম ইরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি যৌথ সামরিক অভিযান। এই অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক সপ্তাহে ওই অঞ্চলে ব্যাপক যুদ্ধবিমান ও রণতরী মোতায়েন করেছে, যা ইরাক যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।
ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট, জমহুরি এলাকা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর সদর দপ্তরের কাছে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। বার্তা সংস্থা এপি (AP) জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয়ের কাছেও একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। এছাড়া তেহরানের উত্তরাঞ্চলীয় সাইয়েদ খন্দান এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
তেহরানের বাইরে কেরমানশাহ, কোম, তাবরিজ, ইসফাহান, ইলাম, কারাজ এবং লরেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণ ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলেছেন
অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় বলেন, "আমরা তাদের নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেব।"
ট্রাম্প আরও জানান যে, ইরানের প্রক্সি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলো (হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুথি) যাতে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বা বিশ্বে কোনো অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই বিষয়েও তিনি আগের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "এই শাসনব্যবস্থা খুব দ্রুতই বুঝতে পারবে যে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো কারো উচিত নয়।"
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযানকে কয়েক দিনব্যাপী চালানোর পরিকল্পনা করেছে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক অ্যালান ফিশার মন্তব্য করেছেন যে, ট্রাম্প সম্ভবত ইরানে একটি বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করছেন। ৭৩ বছর আগে সিআইএ যেভাবে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, এবার হয়তো ট্রাম্প বোমা ও অস্ত্রের মাধ্যমে একই ধরনের পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী
ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে ইরান তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে সাইরেন এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী বর্তমানে এসব হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে।
এর আগে, ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আমরা তোমাদের আগেই সতর্ক করেছিলাম! এখন তোমরা এমন এক পথ বেছে নিয়েছ যার শেষ তোমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।"
ইরানের নেতারা এখন কোথায়?
৮৬ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উত্তেজনা বাড়ার পর গত কয়েকদিন তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তেহরানে তার দপ্তরের যাওয়ার রাস্তাগুলো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা (IRNA) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বর্তমানে নিরাপদ ও অক্ষত আছেন।