Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

‘মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন ‘পাগোল’ কয়’

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ১২ জুলাই,২০২৬, ০১:০৩ পিএম
‘মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন ‘পাগোল’ কয়’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী। ছবি: সংগৃহীত

মোবাইল ফোনে সারাদিন সময় কাটাত চৌদ্দ বছরের শাহিদা। কোনো কিছুতে তার মনোযোগ ছিল না। কেউ ডাকলেও সাড়া দিতে দেরি করে ফেলত। এই অবস্থায় বাবা-মা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিলে শাহিদা স্রেফ বোবা হয়ে গেল। 

তারপর  হঠাৎই একদিন চেচিয়ে বলতে থাকল, 'তোমরা কে কোথায় আছো গো, আমারে বিয়ে দিয়ে দিল গো। আমারে বাঁচাও গো।' এই এক কথাই সে বলতে থাকল ঘুরে ফিরে। রাতে ঘুমাতে যেত না, ক্ষণে ক্ষণে ওই এক কথা। নাওয়া- খাওয়া বন্ধ। মাসখানেক চলার পর যখন অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেল তখন তো আর হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। এক প্রতিবেশী মারফত জানা গেল ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিউট ও হাসপাতালের কথা।

বাবা আর বড় বোন ফরিদা হাসপাতালে এনে ভর্তি করালেন শাহিদাকে। জমির ধান উঠবে বলে দুদিন পরেই বাড়িতে ফিরে যান বাবা। শাহিদার সঙ্গে ফরিদা থাকছে হাসপাতালে। গেল ৭ দিনে শাহিদার ভালোই উন্নতি হয়েছে তবে সময় লাগবে আরো।  

ফরিদার কাছে জানতে চাইলাম, শাহিদা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর লোকজন কি আগের মতো তাকে গ্রহণ করবে?

ফরিদা বললেন, "শাহিদার কথা না হয় পরে আসবে আমার বিয়ে নিয়েই এখন অসুবিধা তৈরি হবে। যারা প্রস্তাব দিয়েছিল তারা এখন দুবার ভাববে। তবে তাই বলে তো বোনকে আর ফেলে দিতে পারি না। কপালে যা আছে তাই হবে।"

শাহিদার বন্ধু-বান্ধব বলতে কিছু ছিল না। খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে বেশি কথাবার্তা বলত না। পোশাক-আশাকের প্রতিও নজর ছিল না। সে সারাদিন বসে বসে মোবাইলে রিল দেখত বা ফেসবুকে পোস্ট পড়ত। ফলে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে চারপাশের জগত থেকে। এটাকেই তার অসুস্থতার কারণ বলে মনে করেন ফরিদা।

পরিবারের শেষ রোজগেরে

সিদ্দিককে বাসে চড়িয়ে নরসিংদী থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন তার বাবা, ছোটবোন  ও দুলাভাই।  দড়ি বাঁধা সিদ্দিককে বাসে তুলতে চায়নি কন্ডাক্টর। কিন্তু মাইক্রোবাস ভাড়া করার সামর্থ্য তাদের ছিল না।

সিদ্দিকের মানসিক সমস্যা প্রথম দেখা দেয় ছয়-সাত বছর আগে। কিছুদিন চলে পরে আপনাআপনি ভালো হয়ে গিয়েছিল। তখন সে জোগালির (রাজমিস্ত্রির সহকারি) কাজ করেছে। তিনবোনের সে এক ভাই।   রোজগেরে বলতে সিদ্দিক একা, বাবা বৃদ্ধ।

এবার অসুস্থ হওয়ার আগে সে বিয়ে করার জন্য খেপে গিয়েছিল। বাবাকে মারধর করেছিল। তাকে বিয়েও করানো হয়েছিল। তবে বিয়ের তিনদিন পরেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো আলাদা ঘরে, নইলে ভাঙচুর চালাত আর মারধর করত।

সিদ্দিকের বাবা আলাল মিয়া খুবই সহজ সরল। তার বোন বললেন, "আমাদের একটু দেখবেন, আমরা খুব গরিব। যা পারেন সাহায্য করবেন। গরিব মানুষ আরো গরিব হয়ে গেলাম।"

সতুর হাই কানেকশন

সত্যেন্দ্রনাথকে সতু বলে ডাকে পরিবারের লোকজন। নেত্রকোনা শহরে বাড়ি। বংশ পরম্পরায় মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তার একটি কন্যাসন্তান আছে। সতুর বাবা ও মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। 

সে কোনো ঝামেলা করে না তবে আপন মনে বকে, কাজ-কর্মে মন নেই, নেশাদ্রব্যের খোঁজে দিন পার করে এবং বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। বাবা-মা তাকে নিয়ে এসেছেন যদি এখানকার ডাক্তাররা কোনো একটি উপায় করতে পারেন। 

সতুর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তার সঙ্গে বিশ্বের সব বড় বড় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে; যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি, কিম জং উন প্রমুখ। নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার ফোনও লাগে না। হাত কানের কাছে নিয়ে ইচিং, বিচিং ধরনের কিছু কথা বলল এবং জানাল, আপনার কাজ হয়ে যাবে কাল সকালের মধ্যে।

অসহায় এক শিক্ষক

চট্টগ্রাম থেকে সবুজকে নিয়ে এসেছেন তার বাবা। তিনি একজন শিক্ষক। সব ছেলেকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। এলাকায় তার সুনাম রয়েছে। কিন্তু সবুজ তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। 

তাকে অসহায় দেখাল। ডান চোখের ওপরের দিকটা ফুলে আছে। মোবাইল ফোন দিয়ে সবুজ তাকে মেরেছে। অথচ ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। তার রাগ পরিবারের লোকদের প্রতি। তার মনে হয়, পরিবারের লোকেরা একেকজন স্পাই। তার ঘরে ডিভাইস (আড়ি পাতা যন্ত্র) লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সে মাঝে মধ্যেই ঘরের ভিতর ডিভাইস খুঁজতে গিয়ে সব ওলট-পালট করে দেয়, আর স্পাই সন্দেহে গায়ে হাত তোলে।

সবুজ তার বইপত্রও নিয়ে এসেছে হাসপাতালে। এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের লোহার শিকের ওপাশের ডানদিকের প্রথম বেডে তার ঠাঁই হয়েছে। মাঝে মধ্যে তেড়ে ফুড়ে তালা লাগানো দরজায় ধাক্কা দিয়ে বাবাকে বলছে, "আপনি একটা মোনাফেক। আমাকে এখানে নিয়ে আসছেন কেন? আমি তো কিছু করি নাই। আপনি কঠিন শাস্তি পাবেন।"

টপার সিস্টেমও দায়ী

হাসপাতালটির মোট শয্যা সংখ্যা ৪০০, যার মধ্যে ৭০ ভাগ নন-পেয়িং বেড। চারশ বেডের মধ্যে পুরুষদের জন্য ২৪০টি এবং নারীদের জন্য ১৬০টি। ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১৮ ভাগ জনগোষ্ঠি মানসিক রোগে আক্রান্ত, যার মধ্যে শিশু-কিশোর ১২ ভাগ।

চাইল্ড অ্যাডলসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান বললেন, "শিশু কিশোররা সাধারণত কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়। এতে আক্রান্তরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-কানুনকে অগ্রাহ্য করে এবং রীতিনীতি বারবার অমান্য করে। মিথ্যা বলা, অন্যের জিনিস বা টাকা-পয়সা চুরি এমনকি আগুন লাগানোর মতো ঘটনাও এরা ঘটায়। পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।"

শিশুদেরও মন আছে তা বড়রা মানতে চান না। তারা সন্তানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। সন্তানের সামনে পিতা-মাতা বিবাদে লিপ্ত হন। শিশুদেরকে হাতিয়ার করে একে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চান। এতে শিশুমনে চাপ তৈরি হয়। 

শিশুরা মডেল খোঁজে। তারা পরিবারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেললে বর্হিমুখী হয়। তখন বাইরের বড়ভাইদের মধ্যে যার শক্তি বেশি তাকে মডেল বানায়। শক্তি বিস্তারের মনোভাব তার মধ্যেও তৈরি হয়। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার এটি একটি অন্যতম কারণ বলে জানালেন নিয়াজ মোহাম্মদ খান।

শিক্ষাক্ষেত্রে টপার ব্যবস্থার সমালোচনাও করলেন তিনি। কারণ এটি স্বার্থপর যুব সমাজ তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ব্যবস্থাটি বরং এমন হওয়া উচিত যেখানে সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়া যায়। 

আরো বললেন, "শিশু-কিশোররা অনেক কিছুই চেপে রাখে, এ থেকে তাদের মুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। তারা যেন মন খুলে অভিভাবক, শিক্ষকদের কথা বলতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দীর্ঘকাল মনের বেদনা চেপে রাখার পরিণতিতে অনেকে হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।"

বাহাত্তর শতক জমি বন্ধক   

চারতলায় নন-পেয়িং ওয়ার্ডের কাছে পনের দিন ধরে মশারি টানিয়ে থাকছেন লক্ষ্মীপুরের ছমিরদ্দিন মোল্লা। মেয়েকে ভর্তি রেখেছেন তিনি। মেয়েটার রাগ খুব বেশি। স্বামীর সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া করে। একদিন ছমিরদ্দিন নিজেই বকাঝকা করেন মেয়েকে। তারপর থেকে মেয়ের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। সুযোগ পেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। রাস্তার লোকদের বকাঝকা করে। শেষে সহ্যসীমা অতিক্রম করলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। 

মেয়েটার বয়স ত্রিশের কাছে। নাতনির বয়স চার বছর। নানা ও নানীর কাছেই মানুষ নাতনি। এখন মায়ের এই অবস্থায় মেয়েকেও (নাতনি)  সঙ্গে আনতে হয়েছে।

প্রথম দুই মাস চিকিৎসা চালিয়েছেন স্থানীয় বৈদ্য-কবিরাজ-মোল্লা-মুন্সি দিয়ে। যখন যে যার কথা বলেছে তার কাছেই গেছেন ছমিরদ্দিন। খরচ হয়ে গেছে দুই লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করেছিলেন ৭২ শতক জমি বন্ধক দিয়ে। শর্ত হলো যতদিন টাকা শোধ না দিতে পারবেন ততদিন জমি দাবি করতে পারবেন না। 

এবার এসেছেন ১৩ হাজার টাকা নিয়ে। এই টাকা দিয়েছে তার ইতালি প্রবাসী ভাগ্নে। হাসপাতাল থেকে মেয়ের খাবার দিচ্ছে, সে খাবারে মায়েরও হয়ে যায়। কিন্তু তাকে বাইরে থেকে খাবার এনে খেতে হয়, নাতনির নানান আবদারও মেটাতে হচ্ছে। খরচ আছে আরো অনেক কিছুর। তেরো হাজার টাকার মধ্যে আর অল্পই বাকি আছে। 

ছমিরদ্দিন মোল্লা বললেন, "এটা এমন অসুখ পুরা পরিবারকে পথে বসায়ে দেয়। টাকা-পয়সা তো নষ্ট হয়ই, মান-ইজ্জত নষ্ট হয় সবচেয়ে বেশি।"

কুলসুমার যুদ্ধ যেন শেষ হচ্ছে না

ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি কলোনিতে থাকেন কুলসুমা বেগম। জীবিকা বলতে মানুষের বাসায় বাসায় গৃহকর্মীর কাজ। এতে সারা মাস পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তার প্রায় পুরোটাই খরচ হয় ১৫ বছর বয়সী ছেলে আবদুল্লাহর চিকিৎসায়।

আবদুল্লাহর বয়স যখন ছয়-সাত, তখন থেকেই আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ভাঙচুর, মারধর, হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে ওঠা, উদ্ভট আচরণ, সব মিলিয়ে ছেলেকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন কুলসুমা। শেষ পর্যন্ত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন ছেলেকে। মাসে কয়েকবার করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় তাকে। ওষুধে কিছুদিন অবস্থার উন্নতি হলেও আবার হঠাৎ করেই বেড়ে যায় অসুস্থতা। তখন আশপাশের ছোট-বড় কাউকেই রেহাই দেয় না আবদুল্লাহ। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে এলাকার শিশুদেরও মারধর করে বসে।

আবদুল্লাহর দেখাশোনা করেন কুলসুমা একাই। তার স্বামীর এ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই৷ ফলে সংসার, চিকিৎসা, সন্তানের দেখভাল, সবকিছুর ভার একাই টেনে নিয়ে চলেছেন কুলসুমা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক যন্ত্রণা। ছেলের সহিংস আচরণের কারণে এক বাসায় বেশিদিন থাকতে পারেন না। বাড়িওয়ালারা রাখতে চান না।

"সবাই আমার ছেলেরে পাগল পাগল কইয়া ক্ষেপায়। আমারে পাগলের মা কয়। ওর লাইগা এক জায়গায় বেশি দিন থাকতাম পারি না। কেউ রাখবার চায় না। অনেক কষ্টে পইড়া গেছি ওরে নিয়া," বলেন কুলসুমা। 

ফলে বারবার বাসা বদলের ঝামেলাও আছে। বছরের পর বছর ছেলের অসুখের ভারে কুলসুমার শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত এখন। শারীরিক নানা অসুস্থতার কথা জানালেন তিনি। কিন্তু নিজেকে নিয়ে ভাবার অবকাশও যেন তার নেই।

হয়তো ডাক্তারই হতো

বত্রিশ বছর বয়সে ছয়টি বিয়ে করেছেন সোহেল আহমেদ। সোহেল দেখতে হ্যান্ডসাম, শক্তপোক্ত শরীর। 

"সমস্যা কেবল ওই ব্রেইনে। রাগ খুব বেশি। যখন যেটা বলে, সেটা না করা পর্যন্ত কাউকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। ছাত্র ভালো ছিল। ওর নানা বলেছিলেন ডাক্তার বানাবেন। খরচপাতি সব দেবেন। এইচএসসি পাশ করার পরে গন্ডগোল দেখা দিল। রাতে-বিরাতে গিয়ে বাঁশঝাড়ে বসে থাকত। কে নাকি ওকে ডেকে নিয়ে যায়। কিছুতেই কিছু বোঝানো যেত না। পড়াশোনা ছেড়ে দিল। দর্জির কাজ শিখল। তারপর ধরল বিয়ের বায়না। তাকে দেখলে পাত্রীপক্ষের অপছন্দ হতো না। তবে বিয়ের মাসখানেক গড়ালে পাত্রী বাড়ি ছেড়ে পালায়। এভাবে পর পর ছয়বার। এলাকায় জানাজানি হয়ে গিয়েছিল বলে আমরা দূর দূর থেকে মেয়ে আনতাম। জানতাম এটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু তার (সোহেলের) যন্ত্রণা সহ্য করা যেত না। মাঝে মধ্যে সে একেবারে ভালো হয়ে যায়। তখন তার অসুখের কথা আমাদেরও মনে থাকে না। আবার যখন অসুস্থ হয়ে যায় তখন তার জন্য ঘরে থাকতে পারি না," বলছিলেন সোহেলের মা। 

কাঁদছিলেন তিনি। বার বার ছেলের জন্য দোয়া চাইলেন। সোহেলের জন্য তার (মায়ের) সংসার ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। অন্য ছেলেরা বাসা নিয়ে দূরে চলে গেছে। মেয়েরা বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসতে চায় না। সোহেলকে দেখলে নাতি-নাতনিরা ভয় পায়। সোহেলের চিকিৎসা করতে জমিজমাও বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্য ছেলেরা এটা পছন্দ করছে না। তারা সোহেলকে স্থায়ীভাবে হাসপাতালে রেখে দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু মায়ের যে মন মানে না।

মোহনাও থাকছে মায়ের সঙ্গে

মোহনার বয়স পাঁচ। মায়ের সঙ্গে এসে হাসপাতালে থাকছে। চঞ্চলা ছটফটে বাচ্চা। দেখলে আদর করতে ইচ্ছে জাগে। মোহনার বাবা থাকছেন পেয়িং ওয়ার্ডের বাইরে। দিনে বাবার সঙ্গে বাইরে বাইরে ঘুরলেও রাতে মায়ের সঙ্গে ওয়ার্ডের ভিতরে ঘুমায়। একদিন পাশের বেডের এক রোগীর হল্লাচিল্লায় ঘুম ভেঙে কাঁদতে শুরু করে। বাবা খবর পেয়ে ওয়ার্ডের বাইরে নিয়ে আসে। বাবাকে সে বলতে থাকে, কবে বাড়ি যাব, মায়ের কী হয়েছে ইত্যাদি। বাবা কোনো জবাব দিতে পারেননি। 

ওই গভীর রাতে মেয়েকে  নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন দেড় ঘণ্টা। বাবা বললেন, "যার হয় সে বোঝে এ রোগের কী যন্ত্রণা! এক মুহূর্ত আমরা শান্তিতে থাকতে পারি না। সারাদিন চোখে চোখে রাখতে হয় কখন না বাইরে বেরিয়ে যায়! বাইরে গিয়ে নানান কাণ্ড-কীর্তি করে। আড়ালে আবডালে মন্দ বলে এলাকাবাসী। মোহনাকে বলে পাগলের মেয়ে। এ যন্ত্রণা সহ্য করা যায় না। মেয়েটাকে কীভাবে বড় করব সেই ভাবনাই এখন বেশি।"

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শুদ্ধ দেব সরকার বললেন, "মানসিক রোগী মানেই কিন্তু পাগল নয়। এটা সমাজের অধিকাংশ লোক বোঝেন না। মানসিক রোগের ডাক্তারকে বলে পাগলের ডাক্তার। মানসিক রোগীদের শতকরা  মাত্র ১ ভাগকে পাগল বা পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন বলা যেতে পারে। লোকলজ্জায় অনেকেই রোগ লুকিয়ে রাখেন, এতে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। কিছু উন্নতি দেখা গেলে রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শ না মেনে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন। ফলে রোগটি ফিরে ফিরে আসে।" 

"এ রোগ অনেকের ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবশ্যই। এসব রোগীর ক্ষেত্রে পরিবারকে অনেক বেশি সাপোর্টিভ হতে হয়। রোগী পরিবার থেকে সমর্থন পেলে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। সমাজে মিশে যেতে পারলে সে অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায়," যোগ করেন তিনি।

সূত্র : টিবিএস

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)