চাবি কারিগর কারিগর মোসলেম উদ্দীন ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর বড় বাজারের চাল পট্টির এক কোণে একটানা লোহার ঘর্ষণের শব্দ। বাতাসে ওড়ছে রূপালি ধুলো। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত জং ধরা তালা আর চাবির স্তূপ। এর মাঝেই ৫৫টি বছর পার করে দিয়েছেন এক নিভৃতচারী কারিগর— মোসলেম উদ্দীন। অন্যের বন্ধ হয়ে যাওয়া দুয়ার খোলার জন্য তিনি নিপুণ হাতে চাবি গড়েন, অথচ নিজের জীবনের অভাবের তালা খোলার কোনো জাদুকরী চাবি তার আর সন্ধান করা হয়ে ওঠেনি।
গল্পটা শুরু হয়েছিল সেই পাকিস্তান আমলে। শহরতলীর শেখহাটি নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা মোসলেম যখন কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি ছুঁয়েছেন, তখনই মাথার ওপর থেকে সরে যায় পিতার ছায়া। বাবা করিম বক্স মারা যাওয়ার সময় রেখে যান দ্বিতীয় পক্ষের চারটি ছোট সন্তান। সেই শিশু ভাই-বোনদের মুখে অন্ন তুলে দিতে পড়াশোনা ছেড়ে মোসলেমকে নামতে হয় জীবনের কঠিন লড়াইয়ে। ছোট্ট মোসলেমের কাছে সেদিন চাবি তৈরির কাজটা সহজ মনে হয়েছিল। একটি চাবি বানালে মিলত মাত্র ১০ পয়সা। সেই ১০ পয়সার ঘাম ঝরানো আয়েই তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ।
আজ মোসলেমের সেই ভাই-বোনেরা জীবনের শিখরে। কেউ মালয়েশিয়া প্রবাসী হয়ে অঢেল সম্পদের মালিক, কেউ যশোর শহরের চশমাপট্টি ও শেখহাটিতে বড় বড় মার্কেটের অংশীদার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যাদের জন্য মোসলেম নিজের শৈশব আর যৌবন লোহার সাথে ঘষে ক্ষইয়ে দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা এই বড় ভাইয়ের খোঁজ রাখার প্রয়োজনবোধ করেননি। তবে এ নিয়ে মোসলেমের মনে কোনো ক্ষোভের লেশমাত্র নেই। জং ধরা তালার ভেতরে নতুন চাবি ঘোরানোর মতোই তার সহজ স্বীকারোক্তি— ‘বাবার অবর্তমানে ওদের মানুষ করতে পেরেছি, অভাব ছুঁতে দেইনি, এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় জয়।’
আরো পড়ুন-
ট্রেনের সূচিতে বাঁধা রাশিদার জীবন
শুধু ভাই-বোন নয়, নিজের চার ছেলে-মেয়েকেও অভাবের আঁচ লাগতে দেননি। কষ্ট হলেও সবাইকে এসএসসি পাস করিয়েছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন সম্ভ্রান্ত পরিবারে; বড় মেয়ের জামাতা আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। ছেলেরা কাজ করছেন চশমা ও মোবাইলের দোকানে। পৈতৃক ভিটার সাধারণ ঘরেই তার বাস। মোসলেম বলেন, ‘আমার বড় সম্পদ নেই, গাড়ি-বাড়ি নেই। কিন্তু দিনশেষে যখন কাজ সেরে ভালো বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরি এবং সবাই মিলে শান্তিতে খাই, সেই তৃপ্তি কোটি টাকার চেয়েও বেশি।’
৫৫ বছর একই স্থানে বসে কাজ করার ফলে বাজার এলাকার মানুষের কাছে তিনি অতি পরিচিত ও প্রিয় মুখ। প্রয়াত রাজনীতিক নয়ন চৌধুরী থেকে শুরু করে সাধারণ কুলি— সবাই মোসলেমকে ভালোবাসেন। তার কাজের টেবিলের পাশে দীর্ঘকাল বসতেন দুই বন্ধু গৌর মণি আর খোকন। সম্প্রতি খোকন পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। প্রিয় বন্ধুর শূন্যস্থান তাকে কাঁদায়, মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়। তবুও পুরনো মায়ার টানে অন্য কোনো পেশার কথা কখনো ভাবেননি তিনি।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হয় তার। কোনো কোনো দিন সেই আয় কয়েক হাজারেও ঠেকে। যখনই কারো ঘরের তালা বন্ধ হয়ে যায় বা চাবি হারিয়ে যায়, ডাক পড়ে মোসলেমের। দুশ টাকা ফি আর যাতায়াত খরচ দিয়ে মানুষ তাকে পরম ভরসায় বাড়িতে নিয়ে যায়।
জীবনের এই সায়াহ্নে এসে মোসলেম উদ্দীনের আর কোনো নতুন চাওয়া নেই। সঞ্চয় নেই বলে আফসোসও নেই।
যশোরের চাল পট্টির এই বৃদ্ধ কারিগরের কাছে জীবন মানে কেবল একগুচ্ছ লোহার চাবি নয়; জীবন মানে দায়িত্ববোধ। তার কাছে জীবনের সার্থকতা হলো—অন্যের জট খুলে দেওয়া আর নিজের চারপাশটাকে শান্তিতে রাখা। এভাবেই ৫৫ বছর ধরে লোহার ঘর্ষণে নিজের আয়ু ক্ষইয়ে অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে চলেছেন এক নির্মোহ কারিগর।